কোনো একক দেশের মুদ্রা নয়, তৃতীয় দেশের বিকল্প মুদ্রায় রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ভারতীয় রুপিতে লেনদেনের রাশিয়ান ফেডারেশনের দেওয়া প্রস্তাব বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই সভায় ঢাকায় রাশিয়ান ব্যাংকের শাখা স্থাপনের প্রস্তাব খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া মস্কো টু ঢাকা সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুসহ দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানে ‘বিজনেস কাউন্সিল’ গঠনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
গতকাল অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এসব আলোচনা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ইআরডির অতিরিক্ত সচিব (ইউরোপ অনুবিভাগ) ড. রোকসানা তারান্নুম। আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বাংলাদেশ-রাশিয়া ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন’-এর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকের আগে রাশিয়ান ফেডারেশনের প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান চূড়ান্ত করতে এ সভা অনুষ্ঠিত হলো।
জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে লেনদেনে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ভারতীয় রুপিতে নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানান, বৈঠকে ভারতীয় রুপিতে রাশিয়ার লেনদেনের প্রস্তাবটি বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের চলমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
শেষে সিদ্ধান্ত হয়েছে, একক কোনো দেশের মুদ্রায় বাংলাদেশ লেনদেন করবে না; বরং দুই দেশের মধ্যে লেনদেনজনিত সংকট মোকাবিলায় বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারের প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা করবে বাংলাদেশ। সে ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের বাইরে তৃতীয় কোনো দেশের মুদ্রা হতে পারে, যেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত। সূত্র জানান, আওয়ামী লীগ সরকার আমলে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেনের প্রস্তাব দিয়েছিল রাশিয়া। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে চীন ও বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো লেনদেনে সম্মত হয়নি। এ পরিস্থিতিতে এখন ভারতীয় মুদ্রা রুপিতে লেনদেনের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া।
তবে এ দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় লেনদেন বিষয়ে ডলারের বাইরে সুনির্দিষ্ট কোনো একটি দেশের মুদ্রা ব্যবহারের ঝুঁকি নিতে চায় না বাংলাদেশ। ভারতীয় রুপিতে লেনদেনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে দেশে রুপির চাহিদা ও টাকার বিপরীতে বিনিময়হার বেড়ে যেতে পারে, যা আমদানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সে কারণে এ ধরনের লেনদেন প্রক্রিয়ার মাধ্যম হিসেবে কোনো একক দেশের মুদ্রা নির্দিষ্ট না করে বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করবে বাংলাদেশ। তবে সেই বিকল্প মুদ্রাটি কোন দেশের হবে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করবে রাশিয়া।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, ঢাকায় একটি রাশিয়ান ব্যাংকের শাখা খোলার প্রস্তাবটি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি সভায় জানিয়েছেন, ঢাকায় বিদেশি ব্যাংকের শাখা আছে। রাশিয়া সে প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করলে খতিয়ে দেখা হবে। এ ছাড়া সভায় ‘রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল’ গঠন এবং রাশিয়ার আমদানিকারকদের জন্য নির্ভরযোগ্য বাংলাদেশি বস্ত্র সরবরাহকারীদের একটি নিবন্ধনভুক্ত তালিকা তৈরি করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। রাশিয়ার এ প্রস্তাবটি ইতিবাচক মনে করছে ইআরডি। এ বিষয়ে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনে সহায়তা করবে সরকার।
পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতামত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ঢাকা টু মস্কো সরাসরি বিমান চলাচলে রাশিয়ার প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখতে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশে নির্মিতব্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারিগরি সহায়তা দেওয়া এবং বাংলাদেশের কারিগরি (ভোকেশনাল) ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় সহায়তা ও শিক্ষাবৃত্তি বাড়ানোর বিষয়েও প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। এ ছাড়া কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে যৌথ উদ্যোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জ্বালানি খাতে সহায়তাবিষয়ক রাশিয়ান ফেডারেশনের প্রস্তাবের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. রোকসানা তারান্নুম কোনো মন্তব্য করেননি। তবে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি জানান, ‘রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে আমাদের অবস্থান চূড়ান্ত করতে বর্তমান সরকারের আমলে এটি প্রথম প্রস্তুতিমূলক সভা ছিল। পরবর্তীতে আরও সভা হবে।’
জানা যায়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জ্বালানি প্রকল্প এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ-রাশিয়া ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন’ গঠন করা হয়। কমিশনের সর্বশেষ বৈঠকটি ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়।