নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের উপসচিব মো. সামসুল আলম ২০১৮ সালের মার্চে চাকরি থেকে অবসরে যান। পরে তিনি বিএনপির কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। গত বছর গঠিত বিএনপির আসন পুনবির্ন্যাস-সংক্রান্ত কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৩ জুলাই তাঁকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসি সচিবালয়ে এক বছরের চুক্তিতে অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
একই দিন ১১টি কোম্পানি, করপোরেশন এবং সরকারি সংস্থায় বিএনপির পদধারী নেতাদের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে আমলাদের নিয়োগ করা হতো। সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগের নজির রয়েছে। বিএনপির আগের আমলগুলোতে অবশ্য দু-একজন নেতাকে নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী এসব কোম্পানি, করপোরেশন এবং সংস্থায় সরকার যে কাউকে নিয়োগ দিতে পারে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে বাধা নেই।
তবে সুষ্ঠু ও অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্বে থাকা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসিতে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত কাউকে নিয়োগ দেওয়ার নজির নেই। জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি এই নিয়োগকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তারা এই নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, এটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। দলীয় রাজনীতি করা একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করা যায় না। অন্য যেসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ করা হয়েছে, সেগুলো নির্বাহী বিভাগের অংশ, মানে সরকারের অধীন। সরকার চাইলে যে কাউকে নিয়োগ করতে পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সরকারের অধীন নয়; অংশও নয়। এর মূল চরিত্রই নিরপেক্ষতা।
তিনি বলেন, ইসিতে দলীয় কাউকে নিয়োগ দেওয়া মানে, এই চরিত্র শেষ হওয়া। তখন আবার ইসির প্রতি অনাস্থা তৈরি হবে। ৫ আগস্টের আগের মতো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না। সরকারের এই নিয়োগ বাতিল করা উচিত।
বিএনপি করা কর্মকর্তা
বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ সমালোচনা করলেও নিজের নিয়োগে সমস্যা দেখছেন না মো. সামসুল আলম। তিনি সমকালকে বলেন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের ‘রাতের ভোট’খ্যাত নির্বাচনের ফলাফলের তথ্য চাওয়ায় তাঁকে তৎকালীন ইসি সচিব হেলালুদ্দীনের নির্দেশে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই মাস তিন দিন কারাগারে ছিলেন তিনি।
সামসুল আলমের ভাষ্য, তিনি কখনোই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না। নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে কথা বলায় তাঁকে আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। পরে গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে বিএনপির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
জামায়াত-এনসিপির সমালোচনা বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপি তো বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদেরই নিয়োগ দেবে। যুক্তরাষ্ট্রে সব পদেই সরকারি দলের কর্মকর্তাদের নিয়োগ করা হয়। আমি অবসরের পর বিএনপির আসন পুনর্বিন্যাস কমিটিতে ছিলাম মাত্র। এটা কোনো দলীয় পদ নয়। যে কোনো ব্যক্তি তা থাকতে পারেন। তবে আমি এখন নিরপেক্ষ। বিএনপি করি না।
নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগ পাওয়া নৈতিক কিনা– এমন প্রশ্নে এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, কাজের মাধ্যমেই আগামী দিনে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করব।
গত বছরের ৩ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে গঠিত আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য ছিলেন সামসুল আলম। একই কমিটিতে সদস্য ছিলেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের চাহিদা অনুযায়ী, নাকি সরকার থেকে সামসুল আলমকে নিয়োগ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সমকালকে বলেন, ‘এটা আমি পরিষ্কার নই। আমার ধারণায় নেই।’
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার একমাত্র এখতিয়ার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যায় কিনা– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমিও তো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, অতিরিক্ত সচিব সরকারের উচ্চ পর্যায়ের পদ। তাই সরকারের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
সামসুল আলম বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের পক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আন্দোলনও করেছেন। নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও নিয়মিত অফিসার্স ক্লাবের বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, নির্বাচন কমিশনে দলের নেতাকে নিয়োগ দিয়ে দলীয়করণের সব সীমা পার করেছে বিএনপি। অতীতে কেউ এতটা নির্লজ্জতা করেনি। সামসুল আলম যদি চাকরিজীবনে বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে সরকার তাঁকে ভূতপূর্ব পদোন্নতি দিয়ে সম্মান এবং বকেয়া বেতন-ভাতা দিতে পারত। যেমন দেওয়া হয়েছে শত শত বঞ্চিত কর্মকর্তাকে। কিন্তু ৬৭ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি, যিনি সরাসরি দল করেছেন, তাঁকে কীভাবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে পারে?
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, স্থানীয় নির্বাচন এবং আগামী সংসদ নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করতেই সরকার বিএনপি নেতাকে ইসিতে নিয়োগ দিয়েছে।
তবে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ ও আবদুল বারীর বক্তব্য জানতে পারেনি সমকাল।