প্রথমবারের মতো সরকারি প্রকল্পের পরিচালকদের (পিডি) বেতন বা ভাতা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার। পিডি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালায় রয়েছে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের সীমারেখাও। আজ মঙ্গলবার অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে হতে যাওয়া এক সভায় তুলে ধরা হবে প্রস্তাবিত খসড়াটি।
নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করে সরকারি বা বেসরকারি যে কেউ প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আবেদন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে এসংক্রান্ত কমিটি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জনবল কমিটির সুপারিশ প্রয়োজন হবে না।
তবে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বেসরকারি প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের সুযোগ রাখলে দলীয়করণ ও তদবিরের ব্যাপক সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, এক্ষেত্রে প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির ঝুঁকি থাকবে। বিষয়টি দলীয় লোকদের পুনর্বাসনের পর্যায়েও চলে যেতে পারে। এ ছাড়া বেসরকারি নিয়োগপ্রাপ্তদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টিও জটিল হবে।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ নীতিমালা-২০২৬-এর খসড়া অনুসারে, ১ হাজার কোটি বা তার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প পরিচালকরা বেতন পাবেন ৭ লাখ টাকা। উপ-প্রকল্প পরিচালক ৪ লাখ এবং সহকারী প্রকল্প পরিচালক পাবেন সাড়ে ৩ লাখ টাকা। ৫০০ থেকে ৯৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে পিডিদের বেতন হবে যথাক্রমে ৬ লাখ, সাড়ে ৩ লাখ এবং ৩ লাখ টাকা। যে প্রকল্পের ব্যয় ১০০ থেকে ৪৯৯ কোটি টাকার মধ্যে সেটির পিডিরা পাবেন যথাক্রমে ৫ লাখ, ৩ লাখ এবং আড়াই লাখ টাকা। এ ছাড়া ৫১ কোটি থেকে ৯৯ কোটি ব্যয়ের প্রকল্পে পাবেন ৪ লাখ আড়াই লাখ এবং ২ লাখ টাকা। নিচ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের প্রকল্পের পিডি পাবেন সাড়ে ৩ লাখ, উপ-প্রকল্প পরিচালক পাবেন ২ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে আয়কর দেওয়া হবে প্রকল্প থেকে; এজন্য প্রকল্পে রাখা হবে সংস্থান।
খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে এসংক্রান্ত বিদ্যমান ব্যবস্থায় অর্থ বিভাগের জনবল নির্ধারণ কমিটির সুপারিশ প্রযোজ্য হবে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবল পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভায় চূড়ান্ত করতে হবে। তবে রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী অর্থ বিভাগ বা সরকারের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের আইনগত বাধ্যতামূলক অনুমোদন প্রয়োজন হলে তা যথারীতি গ্রহণ করতে হবে।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘সরকারের বাইরে বিভিন্ন সরকারি কেনাকাটা বা প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষতাসম্পন্ন লোক পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। সেই সঙ্গে বড় প্রশ্ন হলো— তারা স্বল্প সময়ের জন্য নিয়োগ পাবেন। ফলে তাদের দায়বদ্ধতা থাকবে খুবই কম। এক্ষেত্রে ফল উল্টোও হতে পারে।’
সম্প্রতি ১২টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় নিয়োগের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করলেন, ‘ওই ১২টি সংস্থার মতো প্রকল্পের ক্ষেত্রেও দলীয় বিবেচনা বা দলীয় আনুগত্যের লোকরা নিয়োগ পেতে পারেন। তাই সরকারের বাইরে পিডি নিয়োগের উদ্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ।’
এ ছাড়া বেতন বাড়িয়ে দিলেই যে ভালো ফল আসবে, তা বলা যায় না বলে মনে করেন সাবেক এই সচিব। তিনি বললেন, ‘দেশের ব্যাংকগুলোতে অনেক বেশি বেতন দিয়ে এমডি, সিইও নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাংক খাতের অবস্থা তো নতুন করে বলার কিছু নেই।’
খসড়ায় প্রকল্প পরিচালক পদে আবেদনকারীর যোগ্যতা ও শর্তাবলির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, পরীক্ষণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অডিট, ক্রয় ও চুক্তি ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও অংশীজন ব্যবস্থাপনায় দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা (প্রেষণে/লিয়েনে, যেখানে প্রযোজ্য) আবেদন করতে পারবেন। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা প্রকল্প পরিচালক, উপ-প্রকল্প পরিচালক এবং সহকারী প্রকল্প পরিচালক পদে আবেদনের যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিগরি জ্ঞান ও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে— এমন বেসরকারি খাতের দক্ষ, জন্মসূত্রে বাংলাদেশি এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব নেই ব্যক্তিরা প্রকল্প পরিচালক, উপ-প্রকল্প পরিচালক এবং সহকারী প্রকল্প পরিচালক পদে আবেদন করতে পারবেন। এগুলোর বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে যোগ্যদের সুযোগ রয়েছে। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগের জন্য আবেদনের তারিখে সর্বোচ্চ বয়স হবে ৬৫ এবং উপ-প্রকল্প ও সহকারী প্রকল্প পরিচালকদের সর্বনিম্ন বয়স ২৫ বছর ধরা হয়েছে।
আরও যেসব যোগ্যতা বিবেচনা করা হবে, সেগুলো হলো— পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রার্থী। এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণে প্রয়োজন রয়েছে, এমন প্রকল্পে ভূমি আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রার্থী অগ্রাধিকার পাবেন। আরও আছে সরকারের আর্থিক বিধিবিধান (প্রকল্পের বাজেট প্রণয়ন, অর্থনৈতিক কোড, বাজেট বিভাজন, অর্থ অবমুক্তি, আইবাস প্লাস প্লাস, হিসাবরক্ষণ ইত্যাদি) ক্ষেত্রে দক্ষ। এ ছাড়া প্রকল্প তৈরি, প্রকল্প বাস্তবায়নকাজে অভিজ্ঞ বিশেষত প্রকল্প পরিচালক/উপ-প্রকল্প পরিচালক/সহকারী প্রকল্প পরিচালক বা প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি অগ্রাধিকার পাবেন। পাশাপাশি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়/অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পরিকল্পনা উইং, নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি।
দুই ধাপে প্রকল্প পরিচালক বাছাই ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। যেমন— প্রাথমিক যোগ্যতা ও নথিপত্র যাচাই এবং যোগ্যতা, দক্ষতা অভিজ্ঞতা ও সাক্ষাৎকারভিত্তিক চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা ব্যক্তি।
প্রকল্প পরিচালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা: নীতিমালার খসড়ায় বলা হয়েছে, স্নাতকপর্যায়ে (ব্যাচেলর সম্মান) প্রথম বিভাগ বা সিজিপিএ ৩ দশমিক ৫-৪ পাওয়াদের অগ্রাধিকার। তবে দ্বিতীয় বিভাগ বা সিজিপিএ ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৪ পাওয়া। এ ছাড়া স্নাতকোত্তর পর্যায়ে (মাস্টার্স ডিগ্রি) প্রথম বিভাগ বা সিজিপিএ ৩ দশমিক ৫-৪ পাওয়া। দ্বিতীয় বিভাগ বা সিজিপিএ ২ দশমিক ৫-৩ দশমিক ৪ পাওয়া। এ ছাড়া আরও অন্যান্য যোগ্যতার বিষয়েও বিস্তারিত বলা আছে।