বাহিনী তিনটি। কোডনেমও আলাদা। মাঝরাতের আগেই চূড়ান্ত হয় সব পরিকল্পনা। এর মধ্যেই অজানা আতঙ্ক নেমে আসে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। রাত গভীর হতেই গ্রেনেড আর গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে চারদিক। শুরু হয় হাজারও মানুষের ছোটাছুটি। নিভে যায় বহু প্রাণ। ‘অপারেশন সিকিউরড শাপলা’, ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ আর ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’- এই তিন কোডনেমের আড়ালেই হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে চালানো হয় গণহত্যা।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উঠে এসেছে এমন বর্ণনা। এ মামলায় আসামির তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ সাংবাদিকদের নামও ঠাঁই পেয়েছে।
তথ্যমতে, নারকীয় এ হত্যাকাণ্ডের পর মামলা হলেও বিচার পায়নি ভুক্তভোগীরা। তবে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর তদন্ত চেয়ে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে হেফাজতে ইসলাম। লিখিত আবেদনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বেশ কয়েকজনের নামও জমা দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তদন্তে নামে তদন্ত সংস্থা। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত শেষে সম্প্রতি চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। আর এ প্রতিবেদনটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা শেষে ২৭ জুলাই ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এতে আসামি করা হয় ৪১ জনকে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় সুনির্দিষ্ট দুটি অভিযোগ আনা হয়। প্রথম অভিযোগে ৫ মে সংঘটিত শাপলা চত্বরে আবু বকর সিদ্দিকসহ ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা আনা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ছাদেক মিয়াসহ ২০ জনকে হত্যা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে হওয়া নিহতের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া রাশেদুল ইসলাম, আবু ইউসুফসহ বহু মানুষকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ও নির্যাতনের মাধ্যমে গুরুতর আহত করা হয়। এসব ঘটনা গণহত্যা, হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় লক্ষ্যভিত্তিক নিপীড়ন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল বলে উল্লেখ করে প্রসিকিউশন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি রায় ঘিরে শাহবাগে গড়ে ওঠে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’। যার মুখপাত্র ছিলেন ইমরান এইচ সরকার। আর এ প্ল্যাটফর্মের সব কর্মসূচিতে সরাসরি মদত জোগায় আওয়ামী লীগ সরকার। তবে ইসলামের অবমাননার অভিযোগ তুলে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় একই বছরের ৫ মে ঢাকামুখী লং মার্চ ও অবরোধের ডাক দেয় সংগঠনটি। কিন্তু এ কর্মসূচি ভন্ডুল করতে ছক কষতে থাকেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের মন্ত্রী-এমপিসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। রসদ জুগিয়ে হেফাজত নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচারে নামে একাত্তর টেলিভিশনসহ কিছু গণমাধ্যম।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪ মে থেকেই আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেন। একই সময় গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান এইচ সরকার ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিররাও হেফাজতের কর্মসূচি প্রতিরোধের ঘোষণা দেন। ৫ মে সকালে ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশমুখে কর্মসূচি পালন শেষে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশের অনুমতি পায় হেফাজতে ইসলাম। তবে সমাবেশস্থলে পৌঁছানোর আগেই গুলিস্তান, পল্টন, কাকরাইল, মতিঝিলের বিভিন্ন স্থানে সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। এতে হতাহত হন হেফাজতের বেশ কয়েকজন কর্মী-সমর্থক। ওই হামলায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী ও যুবলীগ নেতা সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ ওরফে এসএম জাহিদের নেতৃত্বের কথা উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, হেফাজতের সমাবেশ নস্যাৎ করতে ৫ মে রাতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে গণভবনে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে রাতের মধ্যেই যেকোনো উপায়ে সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেন তিনি। দলীয় নেতাকর্মীদেরও একই নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর রাত ১০টার দিকে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের সভাপতিত্বে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের যৌথ বৈঠকে শাপলা চত্বরে সশস্ত্র অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়।
শাপলা চত্বরে অভিযানের লক্ষ্যে নিজ নিজ বাহিনীর আলাদা আলাদা কোডনেমও দেওয়া হয়। পুলিশের অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সিকিউরড শাপলা’, র্যাবের ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ ও বিজিবির ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’। তবে পুরো অভিযানটি ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নামেই বেশি পরিচিতি পায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযানের নকশামতে মাঝরাত থেকেই সমাবেশের আশপাশ এলাকায় সাঁজোয়া যান, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। রাত পৌনে ২টার দিকে মতিঝিলের দিকে এগোতে থাকেন তারা। প্রথমে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল, কালার স্মোক গ্রেনেড ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়। তীব্র ধোঁয়ায় হেফাজতের নেতাকর্মীরা ছোটাছুটি করতে থাকেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন প্রবেশমুখে থাকায় সমাবেশস্থল ছাড়তে পারেননি কেউ। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে জিকির শুরু করেন হেফাজতের কর্মী-সমর্থকরা। অনেকেই তখন ঘুমিয়ে ছিলেন।
রাত আড়াইটার দিকে মতিঝিল এলাকার সড়কের সব বাতি বন্ধ করে ‘ব্ল্যাক আউট’ করা হয়। এরপর চারদিক থেকে শটগান ও মারণাস্ত্র দিয়ে গুলি চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে তখন অনেকেই বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেন। এরপরও রক্তাক্ত হয়ে ওঠে শাপলা চত্বর। তবে অভিযানের পর নিহতদের অনেককে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি ভোরের আলো ফোটার আগেই ফায়ার সার্ভিস ও সিটি করপোরেশনের গাড়ি দিয়ে পরিষ্কার করা হয় পুরো এলাকা।
প্রসিকিউশন জানায়, তদন্তে শাপলা চত্বর ও আশপাশের এলাকায় ৩২ জন নিহতের তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনেও হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ৬১ জন শহীদের তথ্য তালিকা আকারে প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’।
শেখ হাসিনা ছাড়া আসামির তালিকায় থাকা অপর ব্যক্তিরা হলেন- তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, সাংবাদিক ফারজানা রুপা, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) মো. আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এসএম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিএম ফরমান আলী।
বর্তমানে এ মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন- ডা. দীপু মনি, শামসুল হক টুকু, জিয়াউল আহসান, একেএম শহিদুল হক, শাহরিয়ার কবির, আবদুল জলিল মণ্ডল, ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবু। এছাড়া অন্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন হাসানুল হক ইনু। আবদুর রাজ্জাকও গ্রেপ্তার আছেন।
এসব আসামির বিরুদ্ধে দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। একইসঙ্গে পলাতক ৩১ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও বাকিদের আগামী ১৬ আগস্ট হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মামলার গুরুত্ব তুলে ধরেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, দেশের আলেম-ওলামাদের নিঃশেষ করতেই নারকীয় এ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এটি ছিল জেনোসাইড তথা গণহত্যা। মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ হিসেবে এ হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। কেননা অভিযানের নামকরণের ধরন থেকেই এটি স্পষ্ট হয় যে, এটি কোনো সাধারণ অভিযান ছিল না। মূলত ধর্মীয় সংগঠনটিকে নির্মূল করার জন্য এ ধরনের নাম দিয়েছে তারা। দেশের ইতিহাসে এমন বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড কখনও ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।