Image description

যশোরের জাবির ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো ২২ বছর বয়সী সিফাত হোসেনের শেষবারের মতো মাকে বলা কথাগুলো আজও তাড়া করে ফেরে রওশন আরাকে। ১৪ বছর ধরে কত প্রার্থনার প্রদীপ জ্বেলে, কত সাধ্য-সাধনার পর কোলজুড়ে এসেছিল একমাত্র পুত্র সন্তান। সেই সন্তান যখন গণঅভ্যুত্থানে বিজয়ের চূড়ান্ত লগ্নে চিরতরে হারিয়ে যায়, তখন নিভে যায় গর্ভধারিণী রওশন আরার জীবনের শেষ আলোটুকুও।

যশোর সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর ইউনিয়নের শাঁখারগাতী মধ্যপাড়ার একটি জরাজীর্ণ বাড়ি। সেই বাড়িতে এখন ভুতুড়ে নীরবতা। একসময় স্বামী, সন্তান আর স্বজনদের কোলাহলে মুখরিত সংসারটি থেকে একে একে সবাই হারিয়ে গেছেন।

স্বামী চলে গেছেন আগেই। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে দূরে। একজনের সংসার সাতক্ষীরা, অন্যজন সুন্দরবনের কোলঘেঁষা জনপদ আন্দুলিয়ায়। একমাত্র ছেলে প্রাণ দিয়েছেন গণ-অভ্যুত্থানে। ফলে জরাজীর্ণ এই বাড়ির চার দেয়ালের মাঝে শারীরিক অসুস্থতা আর নিদারুণ দারিদ্র্যের সাথে প্রতিদিন একাকী যুদ্ধ করছেন এই মা।

সিফাত হোসেনই ছিলেন এই পরিবারটির একমাত্র আয়ের পথ এবং জীবনের শেষ ভরসা। সংসারের টানাপড়েন ও মাথার ওপর ঋণের বোঝা কমাতে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন সিফাত। মাকে বলেছিলেন, ‘মা, এসব টুকটাক কাজ করে তেমন কিছু হবে না। আমি বিদেশ যাব। ঋণ শোধ করবো।’

কিন্তু সংসারের সমৃদ্ধি ঘটানোর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি সিফাতের। বরং মাকে একলা রেখে কবরে আশ্রয় নিয়েছেন কর্মক্ষম ছেলে।

চব্বিশের সেই রক্তঝরা দিনের কথা বলতে গিয়ে শিউরে ওঠেন রওশন আরা। আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে সিফাত রাজপথে লড়েছিলেন বীরের মতো। ৫ আগস্ট বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সিফাত গোসল সেরে খাটের ওপর লুঙ্গিটা রেখে জননীকে বলেছিলেন, ‘মা, সবাই চলে যাচ্ছে, আমিও যাচ্ছি মা, সমস্যা নেই। আমি দুপুরের পরে ফিরবানে। তুমি যেন ফোন দিও না।’

কথাগুলো বলতে বলতে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান সিফাত। কিন্তু মায়ের মন! সন্তানের নিষেধ সত্ত্বেও দুপুরে দু’বার ফোন দিয়েছিলেন তিনি। অপর প্রান্ত থেকে সাড়া মেলেনি। আসরের নামাজের পর চারপাশে মানুষের হুড়োহুড়ি আর হট্টগোলের শব্দ ভেসে আসে বাড়িটিতে। রওশন আরা জানতে পারেন, তার একমাত্র ছেলে আর বেঁচে নেই। জাবির ইন্টারন্যাশনালের আগুনের লেলিহান শিখা নিমিষেই ভেঙে দিয়েছে তার স্বপ্ন, সাথে মায়েরও।

ছেলে হারানোর প্রায় দুই বছর পরও দুঃখের অবসান ঘটেনি এই হতভাগিনীর। উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি ও ভাতার জন্য সঞ্চয়পত্র ও প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দিলেও মেলেনি নিয়মিত ভাতা। স্থায়ী পুনর্বাসন তো দূরঅস্ত।

মাঝে মাঝে কিছু সংগঠন বা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এককালীন অনুদান কিংবা সামান্য খাদ্যসামগ্রী মিললেও, দীর্ঘমেয়াদি কোনো সহায়তার হাত বাড়ায়নি কেউ। রওশন আরার শরীরে বাসা বেধেছে নানা ব্যাধি। দুর্বল শরীরে হেঁটে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সামর্থ্যও নেই তার। খেয়ে-না-খেয়ে দিন কাটছে এই বিধবা নারীর।

রওশন আরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার ছেলে এই দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু আমার খোঁজ কেউ রাখে না। ছেলেটা যদি থাকতো তাহলে সে-ই আমাকে দেখেশুনে রাখত।’