জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। জোটের শরিক খেলাফত মজলিস ১১–দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে আর অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে একই সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। একই সময়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ধারার সাতটি দলকে নিয়ে নতুন জোটের উদ্যোগ নেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।
তবে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা বলছেন, এখনই ১১–দলীয় ঐক্য ভেঙে যাচ্ছে বা নতুন কোনো রাজনৈতিক জোট হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অন্যদিকে জামায়াতও দাবি করছে, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ না নিলেও জোটে রয়েছে।
১১–দলীয় ঐক্যে মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ ও আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিসের অসন্তোষ নতুন নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা ও সংরক্ষিত নারী আসনে প্রত্যাশিত ছাড় না পাওয়ায় দলটির মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ১১–দলীয় ঐক্য। তার মধ্য থেকে খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এখন জোটের কর্মসূচিতে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তাদের অভিযোগ, জোটে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে অংশ নিতে পারে—এমন ধারণাও তাদের অসন্তোষ বাড়িয়েছে।
খেলাফত মজলিস চায়, স্থানীয় নির্বাচনেও জোটগত সমন্বয় থাকুক। এই প্রেক্ষাপটে গতকাল কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার তৃতীয় সাধারণ অধিবেশনে দলটি ১১–দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ভবিষ্যতে দেশ, জাতি ও ইসলামের জন্য প্রয়োজন হলে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও জানায় দলটি।

খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী প্রথম আলোকে বলেন, খেলাফত মজলিস এখন থেকে এককভাবে কর্মসূচি দেবে। এসব কর্মসূচিতে অন্য দলের কেউ এসে বক্তব্য দিতে পারবেন, খেলাফতের নেতারাও চাইলে অন্য দলের কর্মসূচিতে যেতে পারবেন।
হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে ৭–দলীয় ঐক্যের বিষয়ে জানতে চাইলে খেলাফত মজলিসের এই নেতা বলেন, এখনো ঐক্য প্রক্রিয়া চূড়ান্ত নয় এবং সামনে কী হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
খেলাফত মজলিস এখন থেকে এককভাবে কর্মসূচি দেবে। এসব কর্মসূচিতে অন্য দলের কেউ এসে বক্তব্য দিতে পারবেন, খেলাফতের নেতারাও চাইলে অন্য দলের কর্মসূচিতে যেতে পারবেন।
এর আগে গত জুনে ১১–দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। দলটি তখন জোটের কর্মসূচিতে তাদের নাম ব্যবহার না করারও অনুরোধ জানায়। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা না হওয়া এবং উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই তারা এই সিদ্ধান্ত নেয়।
নতুন ঐক্য হলে এবং সেটি হেফাজতের জ্যেষ্ঠ আলেমদের তত্ত্বাবধানে থাকলে তারাও সেই ঐক্যে থাকবেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্যের আলোচনা শুরু হয়। প্রথমে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ আট দলের ঐক্য গড়ে ওঠে। পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি ও এলডিপি যুক্ত হলে সেটি ১১–দলীয় ঐক্যে রূপ নেয়।
তবে সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আসন ভাগাভাগির বিরোধে ইসলামী আন্দোলন ভোটের আগেই জোট ছাড়ে। তবে পরে বাংলাদেশ লেবার পার্টি যোগ দিলে জোটে সদস্য দল ১১টিই থাকে।
১৬ জুলাই চট্টগ্রামে হেফাজতের আমিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
হেফাজত কী চায়
১১–দলীয় ঐক্যভুক্ত দুটি দল জোটের কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ানোর মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় আসে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমি ধারার সাতটি ইসলামি দলের ঐক্যের বিষয়টি।
১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অংশ নেয়।

হেফাজত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিভেদ কমিয়ে ভবিষ্যতে একসঙ্গে চলার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে। প্রতিটি দলের কাছে লিখিত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর সেগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সাতটি দলের মধ্যে খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি আসন সমঝোতা করে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা হলেও দলটি শেষ পর্যন্ত আটটি আসনে এককভাবে নির্বাচন করে। অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ চারটি আসনে সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যায়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন ভাগাভাগির বিরোধে জোট ছেড়ে এককভাবে নির্বাচন করে। ইসলামী ঐক্যজোটও এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়।
ইসলামপন্থী দলগুলো যাতে ধর্মের বিষয়ে এক থাকে, পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি না করে, সে জন্য হেফাজতে ইসলাম দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ইসলামপন্থী দলগুলো যাতে ধর্মের বিষয়ে এক থাকে, পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি না করে, সে জন্য হেফাজতে ইসলাম দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতাদের মধ্যে ভিন্নমত পাওয়া গেছে। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত তিনজন নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে প্রথম আলোর। তাঁরা মনে করেন, ইসলামপন্থী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ রাখার বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে অতীতেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। নেতৃত্ব, রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং বিভিন্ন দলের ভিন্ন অবস্থানের কারণে এবারও উদ্যোগটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

জামায়াতে জোটের দলগুলোর কী চিন্তা
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যে থাকা কওমি ধারার দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনই জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া কিংবা নতুন জোট করার চিন্তা তাঁরা করছেন না।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত ১১–দলীয় ঐক্য ছেড়ে যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আর ৭ দলের যে ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে, সেটিও এখনো চূড়ান্ত নয়। এ বিষয়ে দলগুলো প্রস্তাব দেবে। এরপর স্পষ্ট হবে, সামনে কী হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ১১–দলীয় ঐক্যের এজেন্ডা হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। এ দাবির আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে হবে। সে জন্য ১১–দলীয় ঐক্যকেও শক্তিশালী করতে হবে।
হেফাজতের উদ্যোগ সম্পর্কে মামুনুল হক বলেন, হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে যে ঐক্যের রূপরেখা, সেটি ধর্মীয় বিষয়ে বোঝাপড়া। দলগুলো প্রস্তাবের আলোকে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে, যেখানে মধ্যস্থতায় থাকবে হেফাজতে ইসলাম। তবে রাজনৈতিক ঐক্যের কোনো আলোচনা হয়নি।
বিরোধী দলের আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক পন্থায় মোকাবিলা করতে না পেরে সরকার ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটছে। পেছন থেকে ইন্ধন দিচ্ছে।
জামায়াত কী ভাবছে
দুটি দলের সাম্প্রতিক অবস্থান নিয়ে ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ প্রথম আলোকে বলেন, এসব দল জোটে আছে। সংসদে আছে। তবে কিছু কারণে তারা কর্মসূচিতে থাকছে না।
৭–দলীয় ঐক্যের উদ্যোগের পেছনে বিএনপি সরকারের ইন্ধন আছে বলে সন্দেহ করছেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক পন্থায় মোকাবিলা করতে না পেরে সরকার ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটছে। পেছন থেকে ইন্ধন দিচ্ছে।
জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আন্দোলন আরও বেগবান হবে বলে মন্তব্য করেন হামিদুর রহমান। তিনি মনে করেন, সেখানে আরও অনেক দলের সমর্থন থাকতে পারে। জোটের পরিধি না বাড়লেও তারা সহায়ক শক্তি হিসেবে থাকতে পারেন।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ১১–দলীয় ঐক্য এখন নতুন বাস্তবতার মুখে। হেফাজতের উদ্যোগে কওমি ধারার দলগুলোর আলোচনা নতুন রাজনৈতিক জোটে রূপ নেবে কি না, তা আগামী কিছু দিনের ঘটনাপ্রবাহেই স্পষ্ট হবে।