চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই চিত্র বদলে গেছে। গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে যেখানে মোট ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৯৮ জন, সেখানে শুধুু জুলাই মাসের প্রথম ২৩ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫৬ জন। অর্থাৎ মাত্র ২৩ দিনেই ছয় মাসের মোট আক্রান্তের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে ডেঙ্গু। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে ডেঙ্গু মোকাবিলায় কী করছে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগই ভর্তি হচ্ছেন নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে। চলতি মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে ভর্তি হওয়া ৩০৫ জনের ১৮৪ জনই নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। নগর থেকে ভর্তি হয়েছেন ১২১ জন। এবার ডেঙ্গুর উপসর্গে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানা বৃষ্টিপাত, বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এবং এডিস মশার দ্রুত বংশবিস্তার ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রধান প্রধাণ কারণ। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা এখনই কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার না করলে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে আগামী দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে। একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চলতি বছরে সর্বোচ্চ আক্রান্ত জুলাই মাসে
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যলয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫৪ জন। এ সময়ে মারা গেছেন দুজন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে আক্রান্ত ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন এবং মারা গেছেন একজন, মার্চে ২০ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মে মাসে ৩৭ জন, জুনে ১২২ জন এবং চলতি জুলাই মাসের ২৩ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫৬ জন এবং মারা গেছেন একজন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যলয় সূত্র জানিয়েছে, আক্রান্তদের মধ্যে নগরের ২৬০ জন এবং জেলার ২৬২ জন। অন্যান্য জেলার ১৩২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৩৭৬ জন, নারী ১৬৫ জন এবং শিশু ১১৩ জন।
বিগত বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড
ডেঙ্গুতে ২০২১ সালে ২৭১ জন আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মারা গেছেন পাঁচ জন। ২০২২ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন পাঁচ হাজার ৪৪৫ জন; ওই বছর মারা যান ৪১ জন। ২০২৩ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৪ হাজার ৮৭ জন; প্রাণ হারান ১০৭ জন। এটি ছিল চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছরগুলোর একটি। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমে চার হাজার ৩২৩ জনে নেমে এলেও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৫। ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন চার হাজার ৮৬৪ জন, ওই বছর ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
নগরে ডেঙ্গুর ৮ হটস্পট
সম্প্রতি নগরে এডিস মশার উপস্থিতি নিয়ে একটি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগ। জরিপে নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডেই এডিস মশার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আটটি ওয়ার্ডে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু মশার উপস্থিতি মিলেছে। তার মধ্যে রয়েছে- উত্তর কাট্টলী (ওয়ার্ড-১০), পাহাড়তলী (ওয়ার্ড-৩), আলকরণ (ওয়ার্ড-২), পশ্চিম বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৭), দক্ষিণ বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৯), দক্ষিণ বালুচরা (ওয়ার্ড-৩৯), পাথরঘাটা (ওয়ার্ড-৩৪) এবং আন্দরকিল্লা (ওয়ার্ড-৩২)-এই আটটি ওয়ার্ডকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জরিপের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শনাক্ত হওয়া এডিস মশার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপটাই প্রজাতির, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক। বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এডিস এলবোপিকটাস, যা ডেঙ্গুর দ্বিতীয় প্রধান বাহক হিসেবে পরিচিত।
উপজেলায় আক্রান্ত বেশি সীতাকুণ্ডে
চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২৬২ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সীতাকুণ্ড উপজেলায়। এই উপজেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৪ জন। এ ছাড়াও বাকি ১৪টি উপজেলার মধ্যে লোহাগাড়ায় ২৩ জন, সাতকানিয়ায় ১৫ জন, বাঁশখালীতে ১৬ জন, আনোয়ারায় ১৩ জন, চন্দনাইশে সাত জন, পটিয়ায় ১৮ জন, বোয়ালখালীতে দুজন, রাউজানে ২৩ জন, ফটিকছড়িতে চার জন, হাটহাজারীতে আট জন, রাঙ্গুনিয়ায় ১১ জন, মীরসরাইয়ে ১৮ জন এবং সন্দ্বীপে ছয় জন।
যা বলছে স্বাস্থ্য বিভাগ
জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু হচ্ছে মশাবাহিত রোগ। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে অবশ্যই মশা নিধন করতে হবে। চট্টগ্রামে দিন দিন ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ইতিমধ্যে জেলার সবকয়টি সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুতের পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।’
কী ব্যবস্থা নিলো সিটি করপোরেশন
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ২৬০ জন নগরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত কোনও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে উপজেলাগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাই এখনই সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে মাত্র ২ থেকে ৩ মিলিমিটার স্বচ্ছ পানিই যথেষ্ট। তাই বাসার ছাদ, ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত পাত্র বা যেকোনো স্থানে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না।’
চসিকের প্রস্তুতি কেমন
চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিধন কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মশা নিধনে আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি যেসব ওয়ার্ডে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে সেসব ওয়ার্ডে ওষুধ ছিটানোর প্রতি বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। হটস্পটগুলোতে ওষুধ ছিটানোর জন্য ৬০ জনের একটি প্রশিক্ষিত টিম তৈরি করা হয়েছে। এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে সকাল-বিকাল লার্ভিসাইড ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।’
আমাদের জনবল এবং ওষুধের কোনও স্বল্পতা নেই জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ছয় মাসের ওষুধ গুদামে মজুত আছে। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ২০৫ জন স্প্রে ম্যান নিয়মিত কাজ করছেন। বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য কাজ করছে বিশেষ স্প্রে টিম।’