Image description

মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি বহুল আলোচিত মামলায় ঘুষের বিনিময়ে এক আসামিকে রাজসাক্ষী করার অভিযোগ তদন্তে গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি চার মাস পার হলেও প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।

এ সময়ের মধ্যে অভিযোগের মুখে থাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম প্রসিকিউশন টিমে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছেন।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলছেন, কমিটির কার্যক্রম চলছে, তদন্ত শেষ হয়নি। শিগগিরই প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এই অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আনেন প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। তিনি তার ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, আশুলিয়ায় সাতজনকে হত্যা ও পাঁচটি মরদেহ পোড়ানোর অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি, পুলিশের সাবেক উপপরিদর্শক শেখ আবজালুল হকের স্ত্রী এক সন্ধ্যায় ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর তামিমের কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন। তার দাবি, বিষয়টি তখনকার চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সুলতান মাহমুদের অভিযোগ অনুযায়ী, তামিম পরে সবার সামনে স্বীকার করেছিলেন আবজালের স্ত্রী তার কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন। পরবর্তীতে আবজালকে রাজসাক্ষী করা হয় এবং চূড়ান্ত রায়ে তাকে ক্ষমা করে আদালত।

একই পোস্টে সুলতান মাহমুদ অভিযোগ করেন, চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা বানানোর মেশিন বানিয়েছিলেন তাজুল ইসলাম। তিনি অর্থের বিনিময়ে রাজসাক্ষী বানিয়ে আসামিকে ছাড় দিয়েছেন।

প্রসিকিউটর তামিম শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এসব তথ্য অসত্য, বানোয়াট, বিদ্বেষপ্রসূত ও কাল্পনিক। তার ভাষায়, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকেই একজন প্রসিকিউটর তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলেছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, আমার বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগ কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। এ ধরনের অপপ্রচার ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের প্রত্যেক সদস্যের সুনাম ক্ষুণ্ন করবে। এতে লাভবান হবেন গণহত্যাকারীরা।’

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ২৪ ফেব্রুয়ারির এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ করছি, আমার ব্যাপারে আনীত অভিযোগের সপক্ষে সামান্য তথ্য-প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না।’

তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, রাজসাক্ষী বিচারে সহযোগিতা করেছেন। আদালত শাস্তি দেওয়া না দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবজালের স্ত্রীর বিষয়টির তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া যায়নি।

এর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি তাজুল ইসলামকে সরিয়ে আমিনুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটর পদে নিয়োগ দেয় সরকার। পরে ১০ মার্চ আমিনুল পাঁচ সদস্যের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেন, যার নেতৃত্বে রয়েছেন তিনি নিজেই।

তবে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রসিকিউশনের ভেতরেই প্রশ্ন রয়েছে। একাধিক প্রসিকিউটরের দাবি, অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো এখনও যাচাই করা হয়নি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুলকে সিসিটিভির ফুটেজ সংরক্ষণের অনুরোধ করা হলেও তা করা হয়নি এবং তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি।

একজন প্রসিকিউটর বলেন, ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের অভিযোগ অস্বীকার করলেও তামিম স্বীকার করেছিলেন, আবজালের স্ত্রী তার কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন। তার দাবি, ওই সময় কক্ষে তামিম ছাড়া অন্য কেউ ছিলেন না। ওই নারী কক্ষে প্রবেশের পর বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পরে তামিম অন্যের সহায়তায় দরজা খুলে বের হন।

আরেকজন প্রসিকিউটর প্রশ্ন তোলেন, তদন্ত কমিটি আদৌ আবজালের স্ত্রীর মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেছে কি না বা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কি না। তার মতে, তামিমের মোবাইল ফোন জব্দ করা উচিত ছিল, কিন্তু তা করা হয়নি।

তদন্তের ধীরগতি এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রসিকিউশন টিমের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভে কোনো কোনো প্রসিকিউটর পদত্যাগের কথাও ভাবছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

প্রসিকিউশন সূত্রের দাবি, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা মামলার তদন্তে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনাস্থলে আবজালের উপস্থিতি শনাক্ত করেছিলেন এবং তার মোবাইল ফোনের ইলেকট্রনিক ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কেও মতামত দিয়েছিলেন। কিন্তু আবজালকে রাজসাক্ষী করার সিদ্ধান্তে তার মতামত নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে তদন্তের জন্য সিসিটিভির হার্ডড্রাইভ উদ্ধার করে সিআইডির কাছে পাঠানো হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন।

অন্য একটি সূত্রমতে, আবজাল ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে গুলি করেছেন। একজন উপ-পরিদর্শক হিসেবে কমান্ডিং পজিশন ছিল তার। লাল টিশার্ট গায়ে হেলমেট পরা অবস্থায় আক্রমণাত্মক মুডে ছিলেন। ঘটনাস্থলের ভিডিও প্রসিকিউশনের কাছে ছিল। তাকে আসামি করা হলে বড় ধরনের শাস্তি হতে পারত।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, অভিযোগকারী সুলতান মাহমুদ তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, তিনি ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের ঘটনা সরাসরি নিজে দেখেননি, সিসিটিভি ফুটেজে দেখেছিলেন। তবে সেই ফুটেজ আর পাওয়া সম্ভব নয়। হার্ডড্রাইভ থেকে ফুটেজ একটি নির্দিষ্ট সময় পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যায়।

তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে নিয়ে আমার চলতে হবে, কাজ করিয়ে নিতে হবে।’

এদিকে, জুলাই বিপ্লবের সময় ব্যাপক এবং বিস্তৃত পরিসরে হত্যার সঙ্গে জড়িত ও নির্দেশদাতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যই ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের ক্ষেত্রবিশেষে যেমন আসামি করা হচ্ছে না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসামি না করে বরং সাক্ষী করার অভিযোগ উঠেছে।

যেমন, গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকার চানখারপুল এলাকার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গুলির নির্দেশদাতা পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে।‌ আবার রামপুরার হত্যাকাণ্ডে সেনা কর্মকর্তারা আসামি হলেও, সেই ঘটনায় জড়িত ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. হায়াতুল ইসলাম খানকে মামলায় আসামিই করা হয়নি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু নির্দেশদাতা কর্মকর্তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা বা মামলার বাইরে রাখার অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে ঢাকার চানখারপুল মোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি স্পটে নেতৃত্বে ছিলেন উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে, শুয়ে ও হাঁটু গেড়ে বসে গুলি চালায় এবং এতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

প্রসিকিউশনের নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসআই আশরাফ টিম লিডার হিসেবে অধস্তন সদস্যদের গুলির নির্দেশ দেন এবং তাদের তাগিদ দেন। ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতি ও নির্দেশনার দৃশ্য একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

তবে তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়। পরে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলায় ৩৯তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর তিনি সাক্ষ্য দেন এবং একই বছরের ১৭ নভেম্বর ওই মামলায় শেখ হাসিনা ও তার দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হয়।

এ ঘটনায় প্রসিকিউশনের প্রভাবশালী সদস্য মিজানুল ইসলামের হস্তক্ষেপে এসআই আশরাফকে সাক্ষী করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। তবে মিজানুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

চানখারপুল মামলার রায়ে আদালত প্রশ্ন তোলে, ঘটনাস্থলে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের ৪০ জন সদস্য উপস্থিত থাকলেও কেন মাত্র তিনজনকে আসামি করা হয়েছে এবং বাকিদের আসামি করা হয়নি। প্রসিকিউটর জোহা আদালতের এই প্রশ্নের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অন্যদিকে, গণঅভ্যুত্থানের সময় ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মো. হায়াতুল ইসলাম খান। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলন চলাকালে তিনি তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলে রামপুরায় আন্দোলনকারীদের দুই দিক থেকে ঘেরাও করে গুলি করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। জবাবে কমিশনারও একমত পোষণ করেন।

প্রসিকিউটর জোহা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) থেকে ওই কথোপকথনের ৫০ সেকেন্ডের অডিও রেকর্ড জব্দ করেন। বক্তব্য বিশ্লেষণে রামপুরার মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে হায়াতুল ইসলাম খান ও হাবিবুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে অডিও রেকর্ডের বিষয়ে প্রসিকিউটর জোহা কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।

সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান চানখারপুল মামলায় আসামি হন এবং বিচারে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু রামপুরার ঘটনায় অন্তত ২৮ জন আন্দোলনকারী নিহত হলেও হায়াতুলকে আসামি করা হয়নি। একই মামলায় সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মো. রাফাত-বিন-আলম আসামি হয়ে কারাগারে রয়েছেন।

প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম বলেন, হত্যার ঘটনায় কেউ জড়িত থাকলে শুধু সাক্ষী হওয়ার কারণে তিনি আইনের হাত থেকে রক্ষা পাবেন, এমন নয়। অভিযোগ পাওয়া গেলে নতুন মামলা হতে আইনগত বাধা নেই।

এসআই আশরাফকে সাক্ষী করার বিষয়ে নিজের হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তিনি আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসার আগ পর্যন্ত আমি তাকে কখনো দেখিনি।

হায়াতুল ইসলাম খানের বিষয়ে তিনি বলেন, তদন্ত কার্যক্রম চলছে। কাউকে অভিযোগ থেকে ছাড় বা অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। প্রসিকিউশনে লোকবল কম থাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ আইন সমিতির সাবেক আহ্বায়ক ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনির হোসেন বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে অধস্তন কেউ অপরাধ করলে নির্দেশদাতা ও নির্দেশ পালনকারী উভয়েই সমানভাবে দায়ী হবেন।

তিনি বলেন, আদালত চাইলে কাউকে রাজসাক্ষী হওয়ার অনুমতি দিতে পারে, কিন্তু তার আগে তাকে আসামি হতে হবে; সরাসরি সাক্ষী করা যায় না।

বিশেষজ্ঞরা দণ্ডবিধির ৩৪, ৩৫ ও ৩৬ ধারার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, একই উদ্দেশ্যে সংঘটিত অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সমানভাবে দায়ী হতে পারেন। তাদের মতে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সরাসরি নির্দেশদানকারী ব্যক্তিকে সাক্ষী বানিয়ে দায়মুক্তি দেওয়া বেআইনি, নৈতিকতা ও যৌক্তিকতার পরিপন্থী হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হায়াতুল ইসলাম খান পুলিশে চাকরির শুরুতে তদন্ত সংস্থার সহসমন্বয়ক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ চৌধুরীর অধীনে প্রবেশনারি অফিসার ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট তাকে বদলি করে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়।