ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের অর্থনীতিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করে তোলা হয় পরিসংখ্যান জালিয়াতির মাধ্যমে। খেলাপি ঋণের তথ্য চেপে রাখা, রপ্তানি আয় বাড়িয়ে দেখানো, জিডিপির প্রকৃত তথ্য আড়াল করা এবং প্রতি বছর জাতীয় বাজেট লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ানো ছিল নিয়মিত ঘটনা। আর্থিক খাতে হাসিনার শাসনামলজুড়েই ছিল বানোয়াট পরিসংখ্যানের ছড়াছড়ি। সরকারের পালাবদল হলেও প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি আয় কিংবা কর্মসংস্থানের মতো স্পর্শকাতর তথ্যউপাত্ত ম্যানিপুলেট বা কাটছাঁট করার পুরোনো সংস্কৃতি এখনো বিদ্যমান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে। ওই কমিটি সংস্কারের জন্য সুপারিশও জমা দিয়েছিল কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটছে। সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই তাদেরও।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার মূল লক্ষ্য ছিল খাতাকলমের হিসাব দেখিয়ে বাংলাদেশকে নিম্ন থেকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে দেখানোর রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি। ওই সময় বানোয়াট পরিসংখ্যানের উন্নয়নগল্পে প্রতারিত হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীরা।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতি ও জীবনমানের উন্নয়ন ছাড়াই হাসিনার শাসনামলে বায়বীয় উন্নয়নের নামে বাজেটের আকার, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার এবং রাজস্ব আহরণের বিশাল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে বাজেট বাস্তবায়ন যেমন কোনো বছরই সম্ভব হয়নি, তেমনি রাজস্ব আহরণেও থেকে গেছে বিশাল ঘাটতি।
অন্তর্বর্তী সরকার বিবিএসের (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো) পরিসংখ্যানকে বিশ্বাসযোগ্য ও সবার আস্থার জায়গায় আনতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। তখন সিদ্ধান্ত হয় বিবিএসকে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া, যাতে জনগণ প্রকৃত তথ্য জানতে পারে। সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে আট সদস্যের বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়, যার সভাপতি করা হয়েছিল পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হোসেন জিল্লুর রহমান আমার দেশকে বলেন, টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল বাংলাদেশের পরিসংখ্যানকে গুণগত মান ও স্বচ্ছতার দিক থেকে দৃশ্যমান করার জন্য। এজন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো নিশ্চিত করা দরকার, সেগুলো কীভাবে সুনির্দিষ্টভাবে বিন্যস্ত করা যায়, সে প্রস্তাবগুলো আমরা তুলে ধরেছি।
বিবিএস সংস্কারে আপনাদের প্রস্তাবনাগুলো সরকার কতটুকু গ্রহণ করেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি দেশের জন্য পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অনেক বেশি। এটা অন্তর্বর্তী কিংবা বর্তমান সরকারের বিষয় নয়, যেকোনো সরকারই এটা অনুধাবন করে। নীতিনির্ধারণে তথ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার প্রস্তাব গ্রহণ করলেও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। আমরা যেহেতু এখন আর নেই, তাই বর্তমান সরকার ওই সংস্কার প্রস্তাবের কতটুকু গ্রহণ করেছে, তা বলতে পারছি না।
ওই টাস্কফোর্সের অন্যতম সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আমাদের কাজ ছিল পরিসংখ্যানকে গুণগত মানের দিক থেকে আরো নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ করে তুলতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করা। সেক্ষেত্রে যতগুলো উপযুক্ত সংস্কার প্রয়োজন ছিল, আমরা তার সবই সুপারিশ আকারে পাঠিয়েছি। কেননা, ভুয়া ও জনতুষ্টির জন্য দেওয়া মিথ্যা পরিসংখ্যান দেশের প্রকৃত চিত্র আড়াল করে এবং সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, আমাদের সুপারিশগুলো সে সময়ের সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তখন বাস্তবায়নে রাজনৈতিক কোনো বাধা ছিল না, তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকতে পারে। টাস্কফোর্সের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হওয়া জরুরি। তাহলে পরিসংখ্যান ব্যবস্থা অনেক উন্নত হবে। বর্তমান সরকারের সময় এর বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করি।
সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী বর্তমানে মন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া বিবিএস তথ্য প্রকাশ শুরু করেছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে সংস্থাটির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. আবু শাহীন মো. আসাদুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, তখনকার টাস্কফোর্সের কার্যক্রম বা সুপারিশ সম্পর্কে আমার তেমন জানা নেই। ওই কমিটির কার্যক্রম ও সুপারিশ স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, আমি আসলে এসব বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানি না। কেননা, তখন আমি অন্য বিভাগে কর্মরত ছিলাম। এখন আমি প্রশাসনিক কার্যক্রম দেখি। তবে যতটুকু জানি, মন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া বিবিএস তথ্য প্রকাশের প্র্যাকটিস শুরু করেছে।
বিবিএসের তথ্যে গরমিল
বাংলাদেশের প্রকৃত জনসংখ্যা কত—এ বিষয়ে সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অমিল দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বিবিএস এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) পরিসংখ্যানেও এ পার্থক্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ইউএনএফপিএর বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি-২০২৫ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৭৮ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিবিএসের ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনার চূড়ান্ত তথ্যে জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার। আবার বিবিএসের বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ২০২৫-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার। ফলে একই দেশের জনসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যাচ্ছে।
বিবিএসের জনশুমারি হয় ২০২২ সালে। এরপর কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। ইউএনএফপিএ ওই তথ্যের সঙ্গে বর্তমান টিএফআরসহ বিভিন্ন সূচক যুক্ত করে বর্তমান জনসংখ্যার একটি প্রক্ষেপণ দিচ্ছে। অন্যদিকে, বিবিএসের পূর্ণাঙ্গ জনশুমারির হালনাগাদ তথ্য জানতে হলে পরবর্তী জনশুমারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, সাধারণত ১০ বছরের আগে নতুন জনশুমারি করা হয় না এবং এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল কার্যক্রম। তবে এর মধ্যবর্তী সময়ে বিবিএস প্রতি বছর ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস সার্ভে পরিচালনা করে, যেখান থেকে জনসংখ্যার ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু সে সংখ্যাও ইউএনএফপিএর প্রক্ষেপণের কম দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যার নির্ভুল তথ্য কেবল পরিসংখ্যানগত প্রয়োজনেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনাসহ প্রায় সব নীতিগত সিদ্ধান্তই সঠিক জনসংখ্যার তথ্যের ওপর নির্ভর করে। তাই তথ্যের অসামঞ্জস্য নীতিনির্ধারণ ও সম্পদ বণ্টনে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
বর্তমান জিডিপির আকার ও বাস্তবতা
দেশের শিল্প খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা, কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে পতন এবং বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতার মধ্যেই বর্তমান সরকারের আমলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের সাময়িক প্রাক্কলন প্রকাশ করেছে বিবিএস। সংস্থাটির হিসাবে, ওই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে এডিবি একই সময়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছে।
বিবিএসের হিসাবে, প্রথমবারের মতো দেশের অর্থনীতির আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে প্রায় ৫০১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি মূল্যে জিডিপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকা এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়ে হয়েছে তিন হাজার ২০ মার্কিন ডলার। তবে এসব পরিসংখ্যানের সঙ্গে অর্থনীতির বাস্তব চিত্রের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ।
জাতীয় আয় ও জিডিপির তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির ২০২৬ সালের ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদনে জাতীয় আয়সংক্রান্ত তথ্যের মান ‘সি’ গ্রেড দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিডিপি প্রণয়নের পদ্ধতি পুরোনো এবং ‘সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিল’ নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ায় অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বিগত হাসিনা সরকারের পরিসংখ্যান জালিয়াতিকে ‘এক বিস্ময়কর টপ-টু-বটম দুর্নীতির উন্নয়ন’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, বিগত দেড় দশকে আর্থিক খাতকে যেভাবে জালিয়াতিপূর্ণ তথ্যের ওপর দাঁড় করানো হয়েছিল, তা দেশের ইতিহাসে তো বটেই, বিশ্বেও বিরল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত দেড় দশকে জিডিপিসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে আর মূল্যস্ফীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচক বাস্তবতার তুলনায় কম দেখানো হয়েছে। তাদের মতে, জিডিপির এই অতিরঞ্জিত আকার কেবল সরকারের জন্য বাড়তি ঋণ সুবিধাই সৃষ্টি করে।
মূল্যস্ফীতির তথ্য চেপে রাখা
মূল্যস্ফীতি চেপে রাখতে বহু বছর ধরেই হাসিনা সরকার প্রকৃত তথ্য আড়ালে রেখেছে। ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দ্রব্যমূল্য নিয়ে মানুষের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়। ২০০৫ সালে বাজারে প্রতি কেজি চালের গড় মূল্য ছিল ২৪ টাকা। ২০০৫-২০১০ সময়কালে এ মূল্য ছিল ২৭-২৮ টাকা। হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরই বাজার সিন্ডিকেটের কবলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকে। ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে চালের দাম এক লাফে বেড়ে হয় ৪৫ টাকা। চালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে তেল, চিনি, ডাল ও আটার দাম। তবে অবাক করার বিষয়, মানুষের আয় তেমন না বাড়লেও অর্থনীতির সূত্র পাল্টে দিয়ে মূল্যস্ফীতি কমতে থাকে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমে আসে। ওই বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয় মাত্র ৫ দশমিক ২২ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। এরপর থেকে মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখীই ছিল। মূল্যস্ফীতির এই নিম্নহার জালিয়াতির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে।
বিবিএসের জুন মাসের মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের বাজারে যখন নিত্যপণ্য এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিরাজ করছে, তখন মূল্যস্ফীতির চিত্রে এর পুরোপুরি প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে হয় না। কেননা, গত কয়েক মাস ধরেই সীমিত আয়ের ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ক্রমবর্ধমান ব্যয়ভার সামলাতে বাড়তি চাপের মুখে রয়েছে। সবশেষ মাসে এ চাপ কমেছে বলে বাজারদরের সামগ্রিক চিত্রে প্রতীয়মান হয় না।
রপ্তানি আয়ের তথ্যেও বিতর্ক
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রপ্তানি পরিসংখ্যান নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে প্রকৃত রপ্তানি আয়ের তুলনায় প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার বেশি দেখানোর অভিযোগ ওঠে। ইপিবির হিসাবে ওই সময়ে রপ্তানি ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার, অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে প্রকৃত আয় ছিল ৩৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার।
এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রপ্তানি পরিসংখ্যানে সরাসরি পণ্য রপ্তানির সঙ্গে স্থানীয় রপ্তানি ও নমুনা (স্যাম্পল) রপ্তানির হিসাব যুক্ত করায় প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার বেশি দেখানো হয়। ইপিবির হিসাবে রপ্তানি ছিল ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার কিন্তু এনবিআরের তথ্যে প্রকৃত রপ্তানি ছিল ৪৬ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। একই ভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও ইপিবির হিসাবের তুলনায় এনবিআরের তথ্যানুযায়ী রপ্তানি প্রায় ১৬০ কোটি ডলার কম ছিল।
রপ্তানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য প্রকাশে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এ ধরনের বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যান জিডিপি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদেশি বিনিয়োগ, ঋণ গ্রহণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূচকের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল আমার দেশকে বলেন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, পণ্য রপ্তানির পরিসংখ্যান অতীতের তুলনায় বর্তমানে অনেকটা ঠিক হয়ে এসেছে। ডেটা অ্যানালাইসিস কোনো সহজ বিষয় নয়। এর জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ে। তথ্যগত ভুল উপস্থাপন বা তথ্য সঠিকভাবে বোঝার ঘাটতির কারণে অনেক সময় তথ্য বিভ্রাটের সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, উন্নত দেশের পরিসংখ্যানের সঙ্গে আমাদের দেশের তুলনা চলে না। তাদের তথ্য সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়াই ডিজিটালাইজড। আমাদের ডেটা সংগ্রহ পুরোপুরি ডিজিটাল না হওয়া পর্যন্ত হয়তো কিছু গরমিল থেকে যেতে পারে।