এই চুক্তির সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং চীনের সঙ্গে সৌদি আরবের পারমাণবিক সহযোগিতা—দুটোরই গভীর কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। এগুলো বোঝা গেলে কেন যুক্তরাষ্ট্র এখন সৌদিকে এই সুবিধা দিচ্ছে, সেটিও পরিষ্কার হয়।
১. ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা: সৌদি চুক্তির প্রধান চালিকাশক্তি
এটি মূলত নিরাপত্তা ভারসাম্যের (Balance of Power) প্রশ্ন। ইরান বহু বছর ধরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (uranium enrichment) করছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান চাইলে এই সক্ষমতাকে পারমাণবিক অস্ত্রে রূপ দিতে পারে।যদিও ইরান দাবি করে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক।
সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গি হলো:
"ইরান যদি পরমাণু অস্ত্রের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়, তাহলে সৌদি আরবও পিছিয়ে থাকবে না।" ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ২০২৩ সালেই বলেছিলেন— "If Iran gets a nuclear weapon, we have to get one."
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি চুক্তি অনেকটা ইরানের পারমাণবিক অগ্রগতির জবাব হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
২. যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল: সৌদিকে নিজের ছাতার নিচে রাখা
ওয়াশিংটনের আশঙ্কা ছিল, যদি তারা সৌদিকে প্রযুক্তি না দেয়, তাহলে সৌদি অন্য দেশ থেকে তা সংগ্রহ করবে। এখানেই আসে চীনের বিষয়টি।
গত কয়েক বছরে সৌদি আরব ও চীনের সম্পর্ক দ্রুত গভীর হয়েছে। চীন—সৌদির সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা; Vision 2030-এর বড় বিনিয়োগকারী; উচ্চপ্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
যদি যুক্তরাষ্ট্র না এগোত, তাহলে সৌদি আরব চীনের কাছ থেকে— পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, জ্বালানি প্রযুক্তি, এমনকি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো নিতে পারত।
ওয়াশিংটনের হিসাব হলো— "চীনের পরিবর্তে আমরা প্রযুক্তি দিলে অন্তত কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে।"
৩. চীনের সঙ্গে সৌদির আগের সহযোগিতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—চীনের সহায়তায় সৌদি আরব ইউরেনিয়াম আকরিক প্রক্রিয়াকরণ (uranium ore processing) নিয়ে কাজ করেছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো সৌদির খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানেও যুক্ত হয়েছে। সৌদির নিজস্ব ইউরেনিয়াম মজুদের সম্ভাবনা নিয়েও দুই দেশ কাজ করেছে।
অর্থাৎ, সৌদি আরবের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্র এখন মূলত চীনের পরিবর্তে প্রধান প্রযুক্তিগত অংশীদার হতে চাইছে।
৪. এখানে আসল ভূরাজনীতি
এই চুক্তির পেছনে তিনটি প্রতিযোগিতা একসঙ্গে কাজ করছে—
(ক) যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান: ইরানের প্রভাব ঠেকানো। সৌদিকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া।
(খ) যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীন: সৌদিকে চীনের কৌশলগত বলয়ে যেতে না দেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখা।
(গ) সৌদি বনাম ইরান: আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে দ্রুত পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি রাখা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম আলোচিত বিষয়
অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির মাধ্যমে আসলে "ল্যাটেন্ট নিউক্লিয়ার ডিটারেন্স" (Latent Nuclear Deterrence) তৈরি করছে। অর্থাৎ, আজ সৌদির হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না; কিন্তু প্রয়োজন হলে কয়েক বছরের মধ্যে অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি থাকবে।
এটি সরাসরি অস্ত্র নয়, বরং "অস্ত্র বানানোর সক্ষমতা" ধরে রাখার কৌশল।
সমালোচকদের সবচেয়ে বড় যুক্তি
সমালোচকেরা বলছেন, এতে মধ্যপ্রাচ্যে ডোমিনো প্রভাব (Domino Effect) তৈরি হতে পারে।
যদি—ইরান সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যায়, সৌদি সমৃদ্ধকরণের অধিকার পায়, তাহলে ভবিষ্যতে তুরস্ক, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিও একই দাবি তুলতে পারে।
ফলে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকলেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা (nuclear latency) পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বস্তুত এই চুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল সৌদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক প্রযুক্তি দেওয়া নয়। এর পেছনে তিনটি বড় কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে:
১. ইরানের পারমাণবিক অগ্রগতির ভারসাম্য রক্ষা।
২. চীনের ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব ঠেকানো।
৩. সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত বলয়ের ভেতরে রাখা।
তবে সমালোচকদের আশঙ্কা হলো, এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেই দীর্ঘদিন ধরে যে বৈশ্বিক পারমাণবিক অ-প্রসারণ (Non-Proliferation) নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, সেই নীতির ভিত্তিকেই দুর্বল করে ফেলতে পারে।