যুদ্ধক্ষেত্রে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ টিকে থাকাই যেখানে কঠিন, সেখানে টানা ৩২৬ দিন, মানে প্রায় এক বছর একটি ছোট মাটির গর্তে কাটিয়ে জীবিত ফিরে এসেছেন ইউক্রেনীয় সেনা সেরহি ক্রিনিতস্কি। রাশিয়ার অবিরাম গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা, ক্ষুধা, তীব্র শীত এবং সহযোদ্ধার মৃত্যু, সবকিছুর মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থান ছাড়েননি। তাঁর এই অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত সাহসিকতার গল্প নয়, বরং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কীভাবে আধুনিক ড্রোনযুদ্ধে রূপ নিয়েছে, তারও এক নির্মম দলিল।
৪২ বছর বয়সী ক্রিনিতস্কি যুদ্ধ শুরুর আগে কোনো পেশাদার সেনা ছিলেন না। কৃষিকাজ ও নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। একসময় দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন কোমায়ও ছিলেন। পরে খরগোশ পালন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ২০২৪ সালের শেষ দিকে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁকে পাঠানো হয় দোনেৎস্ক অঞ্চলের অন্যতম ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্র চাসিভ ইয়ারে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে তিনি ও আরও দুই সেনা একটি অগ্রবর্তী অবস্থানে পৌঁছে মাটির নিচে প্রায় ৩ মিটার বাই ৪ মিটার আকারের একটি গর্ত খনন করেন। সেটিই পরবর্তী প্রায় এক বছর তাঁদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। ক্রিনিতস্কি পরে স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, "এটিকে আশ্রয় বলব, নাকি কবর, বুঝতে পারতাম না।"
যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি ছিল ড্রোন। আকাশে সারাক্ষণ রুশ নজরদারি ড্রোন ও বিস্ফোরকবাহী ড্রোন উড়তে থাকায় দিনের আলোয় গর্ত থেকে বের হওয়ার সুযোগ প্রায় ছিল না। সামান্য নড়াচড়াও শত্রুপক্ষের নজরে পড়ে যেত। ফলে রাতের অন্ধকারই ছিল খাবার, পানি বা গোলাবারুদ পৌঁছানোর একমাত্র সময়। অনেক সময় টানা তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত কোনো রসদ পৌঁছাত না। তখন বেঁচে থাকার জন্য নিহত রুশ সেনাদের ব্যাগ-পকেট থেকে খাবার, সিগারেট, পানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে হয়েছে। এমনকি ভূপাতিত রুশ ড্রোনের ব্যাটারি ব্যবহার করে নিজের মোবাইল ফোন চার্জ দিয়ে ভিডিও ডায়েরি ধারণ করতেন তিনি।
ভিডিওগুলোতে যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতা ধরা পড়ে। কোথাও তিনি কাদামাখা গর্তের ভেতরে বসে কথা বলছেন, কোথাও আবার রুশ সেনাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র দেখিয়ে বলছেন, এগুলোই এখন তাঁর "ছোট অস্ত্রাগার"। আবার একটি ভিডিওতে নিহত রুশ সেনাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট দেখিয়ে রসিকতা করেন, "যেন ডাকটিকিট সংগ্রহ করছি।"
তাঁর দায়িত্ব ছিল যেকোনো মূল্যে ওই অবস্থান ধরে রাখা। প্রতি দুই-তিন দিন পরপর ছোট ছোট দলে রুশ সেনারা হামলা চালাত। কখনো দুই পক্ষের দূরত্ব ২০ মিটারেরও কমে যেত। ক্রিনিতস্কির দাবি, এই সময় তিনি অন্তত ২৩ জন রুশ সেনাকে হত্যা করেন। এক ঘটনায় আহত হওয়ার ভান করে আত্মসমর্পণ করতে আসা এক রুশ সেনা হঠাৎ অস্ত্র তাক করলে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালান তিনি। ইউক্রেনের ২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডও তাঁর ২৩ জন শত্রু সেনাকে হত্যার তথ্য নিশ্চিত করেছে।
যুদ্ধের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্ত আসে ২০২৬ সালের মার্চে। ড্রোন থেকে ছোড়া বোমার স্প্লিন্টারে তাঁর একমাত্র জীবিত সহযোদ্ধা গুরুতর আহত হন। ক্রিনিতস্কি তাঁকে টেনে গর্তের ভেতরে এনে রক্তক্ষরণ বন্ধের চেষ্টা করেন। টুর্নিকেটও ব্যবহার করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সহযোদ্ধাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ভিডিও ডায়েরিতে তিনি বলেন, "সকালে একসঙ্গে হাসছিলাম, সন্ধ্যায় সে আর নেই।" সেই মুহূর্ত থেকে তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন।
সহযোদ্ধার মৃত্যুর পর সামরিক কর্তৃপক্ষ তাঁকে অবস্থান ছেড়ে সরে আসার নির্দেশ দেয়। রাতে হামাগুড়ি দিয়ে তিনি পাশের আরেকটি অবস্থানে পৌঁছান। পরে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিপজ্জনক পথ অতিক্রম করে নিরাপদ এলাকায় ফিরে আসেন। প্রায় এক বছর মাটির নিচে কাটানোর কারণে তখন তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁর হাত কাঁপত, চোখে বারবার ভেসে উঠত যুদ্ধের স্মৃতি।
এই অসাধারণ সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ চলতি বছরের মে মাসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক সম্মান "হিরো অব ইউক্রেন" উপাধি ও অর্ডার অব দ্য গোল্ডেন স্টার পদক প্রদান করেন। বর্তমানে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে তিনি বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন। তাঁর ভাষায়, "ওদের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পেরেছি, দেশ রক্ষার জন্য আমার লড়াই বৃথা যায়নি।"
সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে যেখানে ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও বড় আকারের সেনা মোতায়েন ছিল যুদ্ধের প্রধান কৌশল, সেখানে এখন ড্রোন যুদ্ধ পুরো চিত্র বদলে দিয়েছে। আকাশে সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে উভয় পক্ষই ছোট ছোট গর্ত, বাংকার ও ভূগর্ভস্থ আশ্রয় থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করছে। ফলে সৈন্যদের অনেক সময় মাসের পর মাস একই অবস্থানে আটকে থাকতে হচ্ছে। ক্রিনিতস্কির ৩২৬ দিনের জীবনসংগ্রাম সেই বদলে যাওয়া যুদ্ধেরই এক বিরল ও মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি।