Image description

দিনভর ধর্ষণ, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার নারী-শিশুদের পাশে দাঁড়ান তারা। কারও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন, কারও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করেন, আবার কারও মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সাহস জোগান। অন্যের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই যাদের প্রতিদিনের দায়িত্ব, সেই মানুষগুলোর নিজেদের ঘরেই এখন অভাবের দীর্ঘশ্বাস।

সাত মাস ধরে বেতন-ভাতা না পেয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি), ট্রমা সেন্টার ও ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। সংসারে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। দোকানে জমেছে বাকি, বকেয়া পড়েছে বাড়িভাড়া, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। অবশেষে বেতন-ভাতা ও চাকরির অনিশ্চয়তার প্রতিবাদে কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন তারা।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘মাল্টিসেক্টোরাল প্রোগ্রাম অন ভায়োলেন্স এগেইনস্ট ওমেন (এমএসপিভিএডব্লিউ)’ প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচালিত হচ্ছে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি), ট্রমা সেন্টার ও ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাব। এই প্রকল্পে বর্তমানে ২৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। গত সাত মাস ধরে তাদের বেতন-ভাতা এবং প্রকল্প পরিচালনার জন্য কোনো আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

 

 

এর প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকাল থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ব্যানার টাঙিয়ে কর্মবিরতি শুরু করেন ওসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের সঙ্গে কর্মবিরতিতে যোগ দিয়েছেন ট্রমা সেন্টার ও ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। জনবল রাজস্বকরণ এবং বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে বুধবারও তাদের কর্মসূচি অব্যাহত ছিল। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

বুধবার বিকেলে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ওসিসির কম্পিউটার অপারেটর সুফিয়া খাতুন শান্তার। তিন সন্তানের জননী শান্তা বলেছেন, সাত মাস ধরে কোনো বেতন না পেলেও প্রতিদিন নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু সংসারের বাস্তবতা এখন তাকে অসহায় করে তুলেছে। সন্তানদের খাওয়ানো, পড়াশোনা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে বিভিন্ন দোকানে বাকির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। সময়মতো বাসাভাড়াও পরিশোধ করতে পারছেন না। তবু নির্যাতনের শিকার নারীদের সেবা দিতে কখনো দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি।

একই অবস্থা ওসিসির আইন কর্মকর্তা মেহেরুন্নেছার। দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের আইনি সহায়তা দিয়ে আসছেন। অসংখ্য ভুক্তভোগীকে আইনের আশ্রয় পেতে সহযোগিতা করেছেন। অথচ আজ নিজের ন্যায্য পাওনার জন্য তাকেই আন্দোলনে নামতে হয়েছে।

ওসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মী রেশমার জীবনেও নেমে এসেছে একই দুর্দশা। সাত মাস ধরে বেতন না পেয়ে সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। তার মতো আরও তিনজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীও একই পরিস্থিতির শিকার। সব মিলিয়ে ওসিসির প্রায় ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।

ওসিসির আইন কর্মকর্তা মেহেরুন্নেছা বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগপত্রের ভিত্তিতে কাজ করছি। হঠাৎ জানানো হলো, প্রকল্পে আর রাখা হবে না। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। গত জুনে সারা দেশ থেকে আমাদের ঢাকায় ডেকে পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই প্রক্রিয়াই বাতিল করে দেওয়া হয়। এখন বলা হচ্ছে, নতুন করে টেন্ডার হবে। যে প্রতিষ্ঠান কাজ পাবে, তারা আবার সাক্ষাৎকার নেবে। এতে আমাদের চাকরি পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’

 

 

তিনি আরও বলেন, ‘সাত মাস ধরে আমরা বেতন পাচ্ছি না। বেতনের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, আমরা তার লোকবল নই। যদি আমরা তাদের লোকই না হই, তাহলে আমাদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে কেন? চাকরি না থাকলে সেটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হোক। অথচ কোনো স্পষ্ট জবাবও দেওয়া হচ্ছে না।’

কর্মীরা জানান, এই প্রকল্পে বেতন বন্ধ হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০১৬ সালেও টানা নয় মাস তাদের বেতন বন্ধ ছিল। সেই বকেয়া আজও পরিশোধ করা হয়নি। প্রকল্পটির সর্বশেষ মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। এরপরও লিখিত নির্দেশনার মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলা হলেও জনবল ও পরিচালনা ব্যয়ের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি ওসিসির কার্যক্রম আউটসোর্সিংয়ের আওতায় নেওয়া হয়েছে। ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলে গত ১০ জুন দেশের বিভিন্ন ওসিসির কর্মীরা পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু মাত্র ১৫ দিনের মাথায় সেই পরীক্ষাও বাতিল করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে তাদের চাকরির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

২০০২ সাল থেকে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে রামেকের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার। এখানে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, মেডিকেল সনদ, আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং এবং ডিএনএ পরীক্ষার সুবিধা দেওয়া হয়। বিশেষ করে ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাইরে এই পরীক্ষা করাতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। ওসিসির কার্যক্রম ব্যাহত হলে নির্যাতনের শিকার মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, ফরেনসিক পরীক্ষা, ট্রমা কাউন্সেলিং এবং মেডিকেল সনদ পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে হাসপাতালের মুখপাত্র শেখ শামীম আহমেদ বলেন, ওসিসিতে চিকিৎসাধীন রোগীদের সেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য কী ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। একই সঙ্গে কর্মচারীদের বকেয়া বেতনের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে।