‘ওরে বাবারে..চোকের সামনোত মোর সউগ শ্যাষ হয়্যা গেইল। মন্নের (মরনের) তিস্তা আর হামাক বাইচপার দেইল না। ছাওয়াগুলা এ্যালা কোনটে থাকপে, কায় ওমাক খাওয়াইবে।’
ভিটেমাটি-আবাদি জমিসহ ১৪ রুম বিশিষ্ট পাকা বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় এভাবে বিলাপ করছিলেন রংপুরের গঙ্গাচড়ার নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী কাচারিপাড়া এলাকার আব্দুল মোতলেবের স্ত্রী সুলতানা খাতুন।
গত কয়েকদিনে ওই গ্রামের ১১ পরিবারের ঘরবাড়িসহ অন্তত ৫০ একর আবাদি জমি তিস্তায় বিলীন হয়ে যায়।
যুগের পর যুগ ধরে ওই এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন আব্দুল মোতালেব (৭০)। স্ত্রী ও তিন ছেলেসহ সুখের সংসার ছিল তার, ১৪ রুমের পাকা বাড়িও করেছিলেন। ভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় এলাকার ব্রিফ বাজার থেকে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ স্বেচ্ছাশ্রমে একটি বাঁধও নির্মাণ করেছিলেন স্থানীয়রা।
সপ্তাহখানেক ধরে তিস্তার পানি বাড়া-কমার কারণে সেই বাঁধ বিলীন হয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। তীব্র ভাঙন এলাকাটিকে তছনছ করে দেয়। আব্দুল মোতালেব ছাড়াও আর যাদের বাড়িঘর বিলীন হয়েছে তারা হলেন আনোয়ার হোসেন, আমিনুর রহমান, আবু তালেব, সুরুজ মিয়া, শাহাজুল ইসলাম, শাহজাহান, লেবু মিয়া, মোতালেব হোসেন, সাদেকুল ইসলাম ও সুমন মিয়া। নোহালী ইউনিয়নের কচুয়া থেয়াঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ কাচারিপাড়া গ্রাম।
সরেজমিনে বুধবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, এলাকাটি যেন বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। কষ্টে পাথর হয়ে গেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা। স্বজনরা খোঁজখবর নিতে আসলে কেউ কেউ গলা জড়িয়ে কাঁদছেন। সকাল ৮টায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুপুরে সেখানে পৌঁছান আব্দুল মোতালেবের শ্যালিকা অভাবি পরিবারের আনোয়ারা খাতুন (৫৫), সঙ্গে এনেছেন পান-সুপারি ও অল্পকিছু মুড়ি। তাকে দেখে পরিবারের সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। এমন অবস্থা বিরাজ করছে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটা বাড়িতে। অব্যাহ ভাঙনে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে গোটা গ্রামজুড়ে। ভয়ে কেউ কেউ ঘরের টিন, ইট খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী আরও শতাধিক পরিবার। ক’দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছেন ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো।
আব্দুল মোতালেব বললেন, অনেক যোগাযোগ করেও পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনরোধে কোনো কাজ করেনি। এলাকার সবাই মিলে স্বেচ্ছাশ্রমে একটি বাঁধ দিলেও সেটি টেকানো গেল না। এখনো জিও ব্যাগসহ ভাঙনরোধের ব্যবস্থা নিলে বাকি পরিবারগুলো রক্ষা পাবে।
লেবু মিয়ার ভাষ্য, যাদের ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে তারা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে। অন্যত্র বাড়িঘর সরিয়ে নেবে এমন জায়গাও নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মশিউর রহমান জানান, ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এমন অবস্থা থাকলে গ্রামের আরও শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যাবে।
নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলীর মতে, ভাঙনের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ১১ পরিবারের ঘরবাড়িসহ বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বললেন, ভাঙনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার জানালেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।