Image description

জুলাই অভ্যুত্থানে নরসিংদীর প্রথম শহীদ ছিল ১৫ বছর বয়সি তাহমিদ ভূঁইয়া। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই নরসিংদীতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে শহীদ হয় সে। ঘটনার দুই বছরেও শনাক্ত হয়নি তার বুকে গুলি কে করেসে।

সেদিন পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধের উদ্দেশ্যে নরসিংদী জেলখানা মোড়ে জড়ো হন। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে একটি মিছিল সেখানে পৌঁছালে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও গুলি ছোড়ে। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও কিছু সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীরা আবার জেলখানা মোড়ে জড়ো হয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেন। সংঘর্ষের একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হন তাহমিদ ভূঁইয়া।

তাহমিদ নরসিংদী সদর উপজেলার চিনিশপুর নন্দীপাড়া এলাকার পল্লি চিকিৎসক রফিকুল ইসলামের ছেলে। সে শহরের নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী জান্নাতুল ফেরদৌস মালিহা বলেন, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালিয়ে নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও গুলি করে। এতে তাহমিদসহ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়। তাহমিদকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

 

তার দাবি, ওই দিনের ঘটনায় তাহমিদ ছাড়াও ইমন হোসেন, অনিকসহ আরও কয়েকজন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন।

 

জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ১৮ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে তাহমিদকে হাসপাতালে আনা হয়। তার বুক ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল। বিকেল ৪টা থেকে পৌনে ৬টা পর্যন্ত আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সেই দিনের দৃশ্য এখনো মনে পড়লে চোখে পানি চলে আসে।

 

নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সেদিন স্কুল বন্ধ ছিল। তাহমিদ কোটা আন্দোলনে গিয়ে জেলখানা মোড় এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়। সে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার স্মরণে প্রতি বছর বিদ্যালয়ে শোক পালন করা হয়।

 

তাহমিদের বাবা রফিকুল ইসলাম জানান, তিন ভাইবোনের মধ্যে তাহমিদ ছিল সবার বড় এবং পরিবারের একমাত্র ছেলে। লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রিকেট ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়। স্বপ্ন ছিল বিকেএসপিতে ভর্তি হয়ে একদিন জাতীয় দলের ক্রিকেটার হওয়ার। কিন্তু আন্দোলনের দিনই সেই স্বপ্ন থেমে যায়।

 

তিনি বলেন, ঘটনার দিন দুপুরে পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খেয়েছি। কিছুক্ষণ পর সবার অগোচরে তাহমিদ বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। তার মা বাধা দিয়েছিলেন। পরে খবর পাই, সে গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

 

রফিকুল ইসলামের অভিযোগ, নরসিংদী মোসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়া স্টেডিয়ামের প্রধান ফটকের সামনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে অবস্থানকালে পুলিশ গুলি চালায়। পরে পুলিশ প্রশাসনের চাপে সেদিন রাতেই চিনিশপুর ঈদগাহ মাঠে দুই দফা জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাহমিদকে দাফন করতে হয়।

 

তিনি আরো বলেন, সবার সামনে আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। দুই বছর পার হলেও হত্যাকারীর বিচার দূরের কথা, কে গুলি করেছে সেটিও এখনো জানা যায়নি।

 

একমাত্র ভাইকে হারিয়ে ছোট বোন লিনাত ভূঁইয়া এখনো মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।

 

তাহমিদ হত্যার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে নরসিংদী সদর মডেল থানার ওসি এ আর এম আল মামুন বলেন, ১৮ জুলাইয়ের ঘটনায় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও একজন পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। মামলার তদন্ত এখন সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা পরিচালনা করছে। তবে তাহমিদের বুকে প্রাণঘাতী গুলি ছোড়া ব্যক্তিকে এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।