Image description

বৃহস্পতিবার দুপুর। বনানীর কাকলী ফুটওভার ব্রিজের পূর্ব পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন তাজউদ্দিন। হঠাৎ শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। দৌড়ে চলে গেলেন পাশের যাত্রীছাউনিতে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর সারা শরীর ভিজে একাকার। যাত্রীছাউনিতে এত বেশি ফুটো যে ভিতর আর বাইরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।  রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের এমন দুর্ভোগের চিত্র কেবল বনানীতেই নয়, প্রায় সবখানেই। অধিকাংশ যাত্রীছাউনিরই এমন জরাজীর্ণ দশা!

অপেক্ষমাণ যাত্রী ও পথচারীদের রোদবৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক মানের যাত্রীছাউনি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কাজে আসছে না। কোথাও কোথাও যাত্রীছাউনি দখল করে বসানো হয়েছে অবৈধ দোকানপাট। অধিকাংশ যাত্রীছাউনি রাতে পরিণত হয় মাদকসেবীদের আড্ডাখানায়। নগরবাসীকে বাধ্য হয়েই রোদবৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আসলে যাত্রীর জন্য নয় এসব যাত্রীছাউনি! সম্প্রতি ঢাকা উত্তর (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ (ডিএসসিসি) সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে যাত্রীছাউনিগুলোর এমন বেহাল চিত্র দেখা গেছে। তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়ের পশ্চিম পাশের যাত্রীছাউনির একাংশ দখল করে চালানো হচ্ছে চায়ের দোকান। প্রতিবেদকের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে মাসুদ আহমেদ নামে এক যাত্রী বলেন, ‘যাত্রীছাউনিতে যদি চায়ের দোকানই করা হবে, তাহলে আর যাত্রীছাউনি নাম দিয়ে কী লাভ! আমরা যাত্রীরা বৃষ্টিতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিজি আর ওরা ওখানে দোকান করে। এ বিষয়গুলো দেখার কেউ নেই।’

মৎস্য ভবনের পাশের ছাউনিটি রূপ নিয়েছে ফুলের দোকানে। পল্টন মোড়ে দারুসসালাম মার্কেটের সামনে যাত্রীছাউনি দখল করে বসানো হয়েছে বইপুস্তকের দোকান। তার পাশে পল্টন মোড় থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট ফুটওভার ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তা ও ফুটপাতেও বিভিন্ন দোকান বসানো হয়েছে। মতিঝিল যাত্রীছাউনিতে বসানো হয়েছে ভ্রাম্যমাণ দোকান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন শিশু একাডেমির সামনে যাত্রীছাউনি এখন নার্সারির দখলে! কলাবাগান যাত্রীছাউনিতে ভবঘুরেদের আড্ডা। রাতের আঁধারে বসে মাদকসেবীদের আসর। বসিলা এলাকার একটি যাত্রীছাউনি তো গত দুই বছর ব্যবহৃত হচ্ছে টেম্পো স্ট্যান্ড হিসেবে। শাহবাগ, গুলশান, গুলিস্তান, রামপুরা ও মহাখালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও একই চিত্র। কোথাও হকারের দৌরাত্ম্য, কোথাও ভবঘুরেদের আস্তানা, আবার কোথাও ছাউনির বসার বেঞ্চ পর্যন্ত খুলে নেওয়া হয়েছে। ভেঙে পড়ে আছে টেম্পার্ড গ্লাস।

কাশেম নামে এক পথচারী অভিযোগের সুরে বলেন, প্রখর রোদ কিংবা হঠাৎ বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বা কাক্সিক্ষত বাসটি না আসা পর্যন্ত একটু স্বস্তিতে দাঁড়ানোর জন্য এসব ছাউনি তৈরি করা হলেও বর্তমানে এগুলো ব্যবহারের কোনো পরিবেশ নেই।

কেন এই আধুনিক মানের যাত্রীছাউনিগুলো যাত্রীদের কাজে লাগছে না? এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘যাত্রীছাউনির মূল উদ্দেশ্যই হলো যাত্রীদের রোদবৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় এবং বাসগুলো নির্ধারিত স্টপেজে না থামায় এই বিশাল অবকাঠামোর বড় অংশই এখন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।’

বাসরুট রেশনালাইজেশন কমিটির নকশা অনুযায়ী রাজধানীতে ২২৯টি স্থানে যাত্রীছাউনি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ডিএনসিসি এলাকায় ১৬৮টি এবং ডিএসসিসি এলাকায় ৬১টি স্থান নির্ধারণ করা হয়। এখন পর্যন্ত ডিএনসিসি ৬০টি এবং ডিএসসিসি ৪৪টি নতুন যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেছে। গত কয়েক বছরে দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে নতুন ৭৯টি যাত্রীছাউনি নির্মিত হয়েছে।

সূত্র জানায়, ডিএনসিসি এলাকায় থাকা ১০০টির মতো যাত্রীছাউনির মধ্যে মাত্র ২৯টি সরাসরি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। সেগুলোরও ঠিকমতো দেখভাল করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক জায়গায় যাত্রীছাউনি থাকলেও সেখানে বাস থামে না, আবার যেখানে বাস থামে সেখানে কোনো ছাউনি নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দখল বা তদারকির অভাবই নয়, যাত্রীছাউনিগুলোর নকশাতেও রয়েছে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা। স্থানীয় আবহাওয়া বিবেচনা করে ‘ক্লাইমেট-রেসপনসিভ’ বা আবহাওয়া-সহনশীল নকশা না করায় এগুলো রোদ ও বৃষ্টির তীব্রতা থেকে যাত্রীদের সুরক্ষা দিতে পারছে না।

নগরবাসী ও বিশেষজ্ঞদের দাবি, কোটি কোটি টাকার এই গণমুখী সম্পদকে কার্যকর করতে হলে অবিলম্বে দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকি এবং পরিবহনসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বাসগুলোকে নির্ধারিত স্টপেজে থামতে বাধ্য করা জরুরি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৈৗশলী নাঈম রায়হান খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা তদারকি করব যেন বাসস্টপ দখলে না থাকে। তবে বাসস্টপে যদি বাস না থাকে তাহলে হকারের দখলমুক্ত রাখা সম্ভব হয় না।’

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক ও সরকারের সচিব মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, ‘বেদখল হয়ে যাওয়া যাত্রীছাউনিগুলো উদ্ধারে শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে। যাত্রীছাউনি যেন যাত্রীদের কাজে লাগে আমরা সে উদ্যোগ গ্রহণ করব। দখলকারীরা যত শক্তিশালীই হোক আমরা কাউকে ছাড় দেব না।’