অভিজাত আবাসিক এলাকা বনানীর ই-ব্লক। ১২ ও ১৭ নম্বর সড়কের সংযোগস্থলের দুই পাশে দুটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার। ডিশ ও ইন্টারনেটের তার সাপের মতো ঘিরে রেখেছে ট্রান্সফরমার দুটিকে। অনেক কাটা তার রাস্তায় ঝুলে পড়ে আছে। ঢাকা বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানির (ডেসকো) কর্মীরা বলছেন, মাঝেমধ্যে ট্রান্সফরমার নষ্ট হলে এসব তারের কারণে মেরামত বা পরিবর্তন করতে বেগ পেতে হয়। অনেক সময় বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার জন্যও এসব তার দায়ী।
সড়ক দুটির পাশে অসংখ্য বহুতল ভবনে রয়েছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকান ও করপোরেট অফিস। দৃষ্টিনন্দন এসব ভবনে ঢোকার মুখে ঝুলে থাকা তারের জঞ্জালের কারণে নাখোশ ওই সব প্রতিষ্ঠান মালিক। অনেক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ঢেকে গেছে। কোথাও তার নেমে এসেছে হাতের নাগালে। বনানীর বি ও ই-ব্লক ঘুরে প্রায় সব সড়কেই দেখা গেছে এমন তারের জঞ্জাল। অনেক জায়গায় তার রশি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুতের তারের সঙ্গে। একই চিত্র গুলশান ও বারিধারায়ও। গুলশান-১ নম্বরের ১৬ নম্বর সড়কের ৪ তারকা হোটেল বেঙ্গল ইন-এ ঢোকার মুখেই মাথার ওপরে জট পাকিয়ে আছে তার। বারিধারা দূতাবাস এলাকা কিছুটা ব্যতিক্রম হলেও থাই দূতাবাসের পাশে বিদ্যুতের পিলারেও দেখা গেল ডিস ও ইন্টারনেট তারের জঞ্জাল।
রাজধানীকে ঝুলন্ত তারমুক্ত করার ঘোষণা এসেছিল ২০১৯ সালে। এরপর একাধিকবার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। ২০২৬ সালেও ঢাকার বেশির ভাগ সড়ক, অলিগলি ও মহাসড়কের পাশে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, টেলিফোন ও ডিশ সংযোগের তার আগের মতোই ঝুলছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা বলছেন, অনেক সময় ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হলে এসব প্লাস্টিক আবৃত তারের কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ডিশের তারের ভিতরে তামা থাকে। পিলারগুলোতে তারের জটলার কারণে ঘর্ষণে ভিতরের তামা বেরিয়ে আসে। বৃষ্টির দিন বা ঝড়-বাতাসে বিদ্যুতের খোলা তারের সঙ্গে বাড়ি খেয়ে স্পার্কিং হয়ে আগুন ধরে যায়।
তারের জটলা ছিঁড়ে রাস্তায় বা পানিতে পড়লে বিদ্যুতায়িত হয়ে পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। ২০১৯ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ রাজধানীর ঝুলন্ত তার অপসারণে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেয়। তখন জানানো হয়, বিদ্যুতের খুঁটিতে অবৈধ ঝুলন্ত তারের কারণে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিতরণ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুতের তার কাটা পড়ছে। ট্রান্সফরমারগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। এতে বছরে ১৬ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়। পরবর্তীতে দুই সিটি করপোরেশন, বিটিআরসি, ডিপিডিসি, ডেসকো, নেশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) অপারেটর, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) এবং ক্যাবল অপারেটরদের নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়।
সিদ্ধান্ত ছিল, ধাপে ধাপে সব ওভারহেড ক্যাবল ভূগর্ভস্থ করা হবে। বাস্তবে কোনো সংস্থাই পুরো দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি। বিটিআরসির নীতিমালা অনুযায়ী, এনটিটিএন অপারেটরদের অবকাঠামো ব্যবহার করে আইএসপিগুলোর সেবা দেওয়ার কথা। বহু এলাকায় সেই অবকাঠামো পর্যাপ্ত ছিল না। অনেক আইএসপি বিদ্যুতের খুঁটি ব্যবহার করেই সংযোগ দেয়। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন ঝুলন্ত তার অপসারণে অভিযান চালাতে গেলে আইএসপি ও ক্যাবল অপারেটররা অভিযোগ করে, বিকল্প অবকাঠামো ছাড়া তার কেটে দিলে লাখো গ্রাহকের ইন্টারনেট ও টেলিভিশন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হবে। এরপর বিভিন্ন পক্ষ বৈঠক করে একাধিকবার সময় নির্ধারণ করলেও উদ্যোগটি আলোর মুখ দেখেনি।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঝুলন্ত তার শুধু সৌন্দর্যহানির বিষয় নয়; এটি জননিরাপত্তারও বড় হুমকি। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একক কমান্ড কাঠামোর অধীনে এনে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী কাজ শেষ করতে হবে। অন্যথায় সময়সীমা ঘোষণা হবে। বৈঠক হবে। ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল আকাশ থেকে জমিনে নামবে না।