সীমান্ত পার হয়ে আসে ইয়াবার বড় চালান। ধরা পড়ে শুধুই সাধারণ এক বাহক। আদালতে মামলা হয়, কয়েক মাস পর তার সাজাও হয়। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায় নেপথ্যের মূল মানুষটি। রাজধানীতে বসে কোটি টাকার লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করা সেই গডফাদাররা এতদিন ছিল নিরাপদ। বেশিরভাগ সময় তদন্ত কর্মকর্তারাও ভয়ে তাদের নাম উচ্চারণ করতেন না। তবে এবার বদলাচ্ছে দৃশ্যপট। মাদক সাম্রাজ্যের সেই ‘হোয়াইট কালার ক্রিমিনাল’দের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে আসছে নতুন আইন।
হোয়াইট কালার ক্রিমিনাল কিংবা গডফাদারদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দ্বার উন্মোচিত হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন-২০২৬-এ। পাশাপাশি সাইবার ইউনিট গঠন এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
নতুন আইনের প্রয়োগ হলে ‘অসম্ভব’ অনেক কিছুই সম্ভব হবে বলে মনে করছেন ডিএনসির মহাপরিচালক হাসান মারুফ। তার মতে, এই আইন মাদক কারবারের গডফাদারদের জন্য একটি বিশেষ বার্তা।
বর্তমানে বড় কারবারিরা এখন নিজেরা আর মাদক স্পর্শ করে না। সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রেতা খোঁজে, এনক্রিপ্টেড অ্যাপে দেয় নির্দেশ, ডিজিটাল মাধ্যমে নেয় অর্থ আবার অন্য কাউকে দিয়ে পণ্য পৌঁছে দেয়। পুরো চক্রটি চলে খণ্ড খণ্ড ভাগে
ডিএনসি মহাপরিচালক আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা সাইবার ইউনিট এবং সবশেষ ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আশা করছি, শিগগির প্রকল্প পাস হবে। তবে এর আগ পর্যন্ত আমরা মামলার তদন্তে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবের সহায়তা নেব।’
‘এরই মধ্যে আমরা চারটি মানি লন্ডারিং আইনের মামলায় আসামির সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ পেয়েছি আদালতের কাছ থেকে। নতুন আইনে মাদক শনাক্তে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার, উদ্ধার করা আলামত রাখার জন্য মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়গুলোতে মালখানা স্থাপন এবং ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মাদক মামলার বিচার সম্পন্ন করার বিষয়টি সার্বিক কার্যক্রমকে অনেক বেশি গতিশীল করবে।’
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এক সময় মাদক কারবার ছিল সীমান্ত, গুদাম কিংবা নির্দিষ্ট আড্ডাকেন্দ্রিক। এখন সেই চেনা রূপ গেছে বদলে। মাদক কারবার এখন চলে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম এখন মাদক বেচাকেনার নতুন নেটওয়ার্ক। গোপন অনলাইন ফোরামেও তৈরি হয়েছে মাদক বিক্রির নেটওয়ার্ক। ক্রেতা অর্ডার দেয় অনলাইনে, অর্থ পাঠায় ডিজিটাল মাধ্যমে, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কুরিয়ার বা রাইড শেয়ার সেবার মাধ্যমে পৌঁছে যায় মাদক। বর্তমানে বড় কারবারিরা এখন নিজেরা আর মাদক স্পর্শ করে না। সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রেতা খোঁজে, এনক্রিপ্টেড অ্যাপে দেয় নির্দেশ, ডিজিটাল মাধ্যমে নেয় অর্থ আবার অন্য কাউকে দিয়ে পণ্য পৌঁছে দেয়। পুরো চক্রটি চলে খণ্ড খণ্ড ভাগে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে, বিশ্ব জুড়ে মাদক কারবার হয়ে উঠছে দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর। বিশেষ করে সিনথেটিক মাদক ও নতুন সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থের বাজারে ডার্কনেট, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং ভার্চুয়াল পেমেন্টের ব্যবহার বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। তদন্তকারীদের ভাষায়, বাংলাদেশও এখন এই বৈশ্বিক প্রবণতার বাইরে নেই। এমন বাস্তবতা থেকেই সরকার নিয়ে এসেছে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী। এরই মধ্যে নতুন আইনটি মাদক সাম্রাজ্যে নতুন আতঙ্ক হিসেবে কাজ করছে বলে জানালেন একাধিক মাদক কারবারি।
কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন আইনের মূল লক্ষ্য আর শুধু মাদক উদ্ধার নয়, বরং পুরো অপরাধচক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলা। তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে কে মাদক বহন করেছে তা নয়, বরং কে নির্দেশ দিয়েছে, কে অর্থের জোগান দিয়েছে, কোথা থেকে লেনদেন হয়েছে, কার মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সিন্ডিকেট কে নিয়ন্ত্রণ করেছে এসব।
সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা মনে করেন, এই আইন শীর্ষ মাদক কারবারিদের ধরার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। তবে সবকিছুর সফলতা নির্ভর করবে তদন্ত কর্মকর্তার দক্ষতার ওপর। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘অনেক কিছুই নির্ভর করছে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার ওপর। এই আইনটি জুয়ার কারবারি ও মানি লন্ডারিংয়ে জড়িতদের জন্যও বড় আতঙ্কের বিষয়। তবে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের দুর্বলতা চিহ্নিত হলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে নীতিনির্ধারকদের।’
তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে কে মাদক বহন করেছে তা নয়, বরং কে নির্দেশ দিয়েছে, কে অর্থের জোগান দিয়েছে, কোথা থেকে লেনদেন হয়েছে, কার মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সিন্ডিকেট কে নিয়ন্ত্রণ করেছে এসব।
কেন গডফাদারদের ধরতে ব্যর্থ হচ্ছিল বিদ্যমান আইন: তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, বড় মাদক কারবারিরা বহু আগেই কৌশল বদলে ফেলেছে। তারা নিজেরা কখনো মাদক স্পর্শ করে না। একজন চালান আনে, আরেকজন গুদামে রাখে, তৃতীয় ব্যক্তি অনলাইনে অর্ডার নেয়, চতুর্থ ব্যক্তি টাকা সংগ্রহ করে আর পঞ্চম ব্যক্তি সরবরাহ করে। ফলে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে শুধু নিচের স্তরের সদস্যরা। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তে দেখা গেছে, লাখ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য, শত শত ফোনকল কিংবা অসংখ্য অনলাইন কথোপকথনের প্রমাণ থাকলেও অভিযুক্তের কাছ থেকে মাদক উদ্ধার না হওয়ায় মামলার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সুযোগেই বছরের পর বছর আইনের নাগালের বাইরে থেকেছে বহু গডফাদার।
ডিজিটাল প্রমাণই হবে সবচেয়ে বড় অস্ত্র: নতুন আইনে তদন্তকারীরা কলরেকর্ড, মোবাইল ফোনের তথ্য, চ্যাট হিস্ট্রি, ইমেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যোগাযোগ, সিসিটিভি ফুটেজ, আইপি লগ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, ই-ওয়ালেট এমনকি ক্রিপ্টোকারেন্সির তথ্যও আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক মামলার আধুনিক তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো ‘ফলো দ্য মানি’। অর্থাৎ মাদক নয়, টাকার পথ অনুসরণ করলেই বেরিয়ে আসে পুরো সিন্ডিকেট। কে টাকা পাঠাল, কার অ্যাকাউন্টে জমা হলো, কোন ডিজিটাল ওয়ালেটে গেল, কোথা থেকে বিদেশে স্থানান্তর হলো— এই অর্থের গতিপথই এখন সবচেয়ে বড় আলামত। নতুন আইনে আদালতকে ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ বা বাজেয়াপ্তের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। এতে শুধু মাদক নয়, অপরাধচক্রের আর্থিক ভিত্তিতেও আঘাত হানা সম্ভব হবে।
নতুন মাদক আইনে কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত গুরুতর মাদক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে বা কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের মাধ্যমে মাদকসংক্রান্ত অপরাধ করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
প্রযুক্তির বিরুদ্ধে প্রযুক্তিই অস্ত্র
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অধীনে গড়ে তোলা হচ্ছে আলাদা সাইবার ইউনিট। গত জানুয়ারিতে ডিএনসি থেকে ৬৪ জনবলের একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই ইউনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডার্ক ওয়েব, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং ভার্চুয়াল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে নজরদারি চালাবে। পাশাপাশি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে একটি আধুনিক ফরেনসিক ল্যাবরেটরি স্থাপনেরও, যেখানে রাসায়নিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাও করা যাবে। কর্মকর্তাদের ভাষায়, ‘এখন আর শুধু অস্ত্র দিয়ে নয়, সফটওয়্যার দিয়েও মাদকবিরোধী যুদ্ধে লড়তে হবে।’