সংসদের বাজেট অধিবেশনে মূলত চারটি ইস্যুতে তৈরি হয়েছে সরকারি ও বিরোধীদলীয় জোটের মতবিরোধ। সংবিধান সংশোধন, জুলাই সনদ, মুক্তিযুদ্ধ, মদ নিষিদ্ধ ইস্যুতে বিপরীতমুখী অবস্থানে তারা। এরই মধ্যে ওয়াকআউটের মতো ঘটনাও ঘটেছে, উত্তপ্ত হয়েছে সংসদ ফ্লোর। আগামী অধিবেশনে এসব ইস্যুতে কী সমাধান হয়- তা নিয়ে আগ্রহ সংশ্লিষ্টদের। বিরোধীদলীয় জোটের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয়ে এরই মধ্যে রাজপথে নামার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সরকারদলীয় জোটের পক্ষ থেকে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সদ্য সমাপ্ত হওয়া সংসদের বাজেট অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন করতে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের পাঁচজন এমপির নাম বাকি রেখেই বিশেষ কমিটি গঠন করে সরকারদলীয় জোট। ১৭ সদস্যের কমিটিতে ১২ জন এমপিকে রাখা হয়েছে। এখন অপেক্ষা বিরোধী দলের পাঁচ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করার। ওই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন জামায়াত নেতৃত্ব¡াধীন বিরোধীদলীয় এমপিরা। অধিবেশন সমাপ্ত হওয়ার শেষ ক্ষণ পর্যন্ত নামের অপেক্ষায় ছিল সরকারদলীয় জোট। এ নিয়ে পর্দার আড়ালে অনেক দেনদরবারও হয়েছে। বিষয়টি দুই জোটের শীর্ষ নেতারা বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে স্বীকারও করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনড় অবস্থানে থেকে যায় বিরোধীদলীয় জোট। তারা কমিটিতে নাম না দেওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে সংবিধান সংশোধন। পাশাপাশি ইস্যুটি নিয়ে দুই জোটের মধ্যে মতবিরোধ এখন তুঙ্গে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে একে অপরের দিকে তির ছুঁড়েছেন দুই জোটের শীর্ষ নেতারা। সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে এ নিয়ে একাধিকবার দুই জোটের এমপিদের মধ্যে বাদানুবাদ হয়েছে। পাল্টাপাল্টি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। জুলাইয়ের কৃতিত্ব নিয়েও তোলা হয়েছে নানা ধরনের প্রশ্ন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে বরাবরই অভিযোগ করা হয়েছে সরকারদলীয় জোটের আন্তরিকতা নিয়ে। অন্যদিকে সরকারদলীয় জোটের পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় জোটের এমপিদের দুই শপথ নিয়ে সদ্য শেষ হওয় সংসদে প্রশ্ন তোলা হয়। এ নিয়েও দুই জোটের মধ্যে মতবিরোধ বিদ্যমান।
মুক্তিযুদ্ধ ইস্যু নিয়েও দুই জোটের মধ্যে মতপার্থক্য সুস্পষ্ট। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে একাধিক এমপি মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে খোঁচাখুঁচি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
গত ২৮ জুন বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘একাত্তর সালের ভূমিকার জন্য আপনারা একবারও ক্ষমা প্রার্থনা করলেন না। জাতির সামনে আপনাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত ছিল। কিন্তু আপনারা তা করতে পারেননি। উপরন্তু আপনাদের নেতা তখন প্রফেসর গোলাম আযম সাহেব বলেছিলেন, একাত্তরে আমরা ভুল করিনি। এখনো সময় আছে এবং আপনাদের বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত।’
বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান এর সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, অতীতে সংসদে বা রাজনীতিতে যে ‘খোঁচা মারার’ বা নেতিবাচক চর্চা ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারের সমালোচনা করা হবে, তবে তা হতে হবে সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে থেকে। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, বিরোধী দলকে হেনস্তা করার মতো খারাপ রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন পরিহার করা হয়। তিনি ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং দুর্নীতিমুক্ত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান। এর বাইরে মদ ও জুয়া আইনসহ আরও অন্তত অর্ধ ডজন বিল নিয়ে দুই জোটের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। যদিও শেষ পর্যস্ত সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ওসব বিল সংসদে পাস হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে দুই জোটের নেতারা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ খুবই স্বাভাবিক এবং গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থেই সুস্থ রাজনৈতিক বিতর্ক প্রয়োজন। কিন্তু এই বিরোধ ও দূরত্ব যেন অতীতের মতো জাতীয় সংসদকে অকার্যকর করে না ফেলে, সেটিই সবার প্রত্যাশা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এবং বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন ১৫ জুলাই শেষ হয়েছে।
গত ৭ জুন শুরু হওয়া ২৬ কার্যদিবসের এ অধিবেশনে ১০টি সরকারি বিল পাস হয়েছে। বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা চলে ১৪ কার্যদিবস ধরে, যেখানে ৩১৬ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। সংসদ সচিবালয় জানায়, বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট স্থায়ী হয়। আলোচনায় সরকারি দলের ২০০ জন এবং বিরোধী দলের ৯১ জন সদস্য বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়া সংরক্ষিত আসনের সদস্য ও স্বতন্ত্র সদস্যরাও আলোচনায় অংশ নেন। সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিসহ মোট ১৮টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।