Image description

বন্যায় সব হারানো পরিবারগুলোতে চলছে হাহাকার। ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পাহাড়ের বন্যার্তরা। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় অনেক পরিবার হারিয়েছে শেষ আশ্রয়স্থল। চট্টগ্রামে নিম্নবিত্ত মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই এখনো। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কাজ পাচ্ছেন না অনেকে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় অনেকের বসতঘর ধসে পড়েছে। তারা পরিবার নিয়ে কষ্টে আছেন। মৌলভীবাজারের রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলার কৃষকরা বলছেন, বানের পানিতে সম্পদ নয়, তাদের স্বপ্ন ভেসে গেছে।

চলতি মাসের ৫ জুলাই থেকে সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারী বর্ষণ হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে চট্টগ্রাম ও সিলেটে মাসের সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়।

রাঙামাটি : ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পাহাড়ের বন্যার্তরা। চারদিকে বন্যার তাণ্ডবের ক্ষতচিহ্ন। কোথাও পড়ে আছে ঘরের চালা। আবার কোথাও আছে হাটবাজারের সরঞ্জাম। বসতঘর, দোকানপাট, সবখানে কাদা আর কাদা। অন্যদিকে একেবারে বিধ্বস্ত ফসলের খেত, ধানি জমি। বন্যার পানি নেমে গেলেও রেখে গেছে ধ্বংসস্তূপ। এই চিত্র রাঙামাটির সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ির।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সম্প্রতি টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে বাঘাইছড়ি উপজেলার ৩০টি গ্রাম। ফসল আর জমি কোনো কিছুর চিহ্ন পর্যন্ত নেই। ভেঙে গেছে সড়ক, কালভার্ট। গবাদি পশুর খামার। গৃহপালিত গরু কিছুই নেই। স্বল্প আয়ের মানুষের নিজের গড়া ছোট চায়ের দোকান নেই। সব বিলীন হয়ে গেছে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে। একই অবস্থা অপর উপজেলা বিলাইছড়ির। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে এ উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের মানুষ। হাটবাজার তছনছ হয়ে গেছে। বসতঘরে হাঁটু সমান কাদা। সড়কে জমেছে পলিমটির স্তূপ। হাট বসে না ফারুয়া বাজারে। আগের মতো মানুষের আনাগোনাও নেই। দোকানের কোনো অস্তিত্ব নেই। স্থানীয়দের বসতঘরে নেই কোনো সরঞ্জাম। হাঁড়িপাতিল, চেয়ার টেবিল, কাপড়, ফ্যান কিছুই নেই। সব হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব এ অঞ্চলের মানুষ।

বিলাইছড়ি ফারুয়া ইউনিয়নের বিদ্যালাল তংঞ্চঙ্গ্যা বলেন, সরকারিভাবে মাত্র ১০ কেজি করে চাল পেলেও আর কিছুই পায়নি তারা। এত সব ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে উঠবে এ ইউনিয়নের মানুষ। তাদের ক্ষতিপূর্ণ দেওয়া না হলেও যাতে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে প্রশাসনকে। তা  না হলে এ এলাকার মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। কক্সবাজার : চকরিয়া উপজেলার মাইজ কাকারা এলাকার দিনমজুর মিজানুর রহমান বন্যায় হারিয়েছেন তার শেষ সম্বল বসতঘর। তিন সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। টানা বৃষ্টি ও বন্যার সময় কোমরসমান পানিতে ডুবে ছিল তার ঘর। পানি নেমে গেলে সেটি ধসে পড়ে। মিজানুর রহমানের স্ত্রী  জাহেদা বলেন, বন্যা আমাদের মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁইটুকুও কেড়ে নিয়েছে।

কাকারা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়তলী এলাকার আবু সাঈদ মাটির তৈরি ঘর অতিবৃষ্টিতে ধসে পড়ে। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে তিনি অন্যের আশ্রয়ে আছেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করলেও বর্তমানে কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন আবু সাইদ। একই ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের জসিম উদ্দিনের সেমিপাকা ঘর পাহাড়ধসে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। বর্তমানে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত। আট সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী জসিম পেশায় টমটম চালক। জসিম উদ্দিন বলেন, মাত্র সাত-আট মাস আগে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ঘরটি নির্মাণ করেছিলাম। পাহাড়ধসে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব বুঝতে পারছি না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো স্থানীয়ভাবে কিছু ত্রাণসহায়তা পেলেও স্থায়ী আবাসনের কোনো ব্যবস্থা হয়নি। 

ফলে তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছি। কিছু পরিবারকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা  নির্ধারিত ফরমেটে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম জেলার বেশির ভাগ উপজেলায় পানি নেমে যাওয়ার পর সরকারি বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রমের কারণে বন্যার্তদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি আসলেও প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের নতুন সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো কাজের সংস্থান না পেয়ে অনেকে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন। বাহারছড়া ইউনিয়নে ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত স্থানীয় বাসিন্দা শাহেদ এমরান শহীদ গতকাল সন্ধ্যায় জানান, যাদের ঘরবাড়ি বন্যায় ভেসে গেছে তাদের অনেকে এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে এবং স্বজনদের বাড়িতে থাকছেন। যারা দিনমজুরের কাজ করতেন তারা এখনো কোনো কাজ পাচ্ছেন না।

যারা মাছ ধরতেন তাদের অনেকের জালও বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। এ কারণে উপকূলীয় এলাকার অনেক বাসিন্দা মানবেতর জীবন পার করছেন। বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, বন্যার শুরু থেকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়। বন্যা শেষ হওয়ার পরও শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার বিতরণ কার্যক্রম চলছে। তবে উপকূলীয় কিছু এলাকা দুর্গম হওয়ায় সঠিক সময়ে ত্রাণ পৌঁছানো যায়নি। তবে যে কোনো জায়গা থেকে খবর পেলে ত্রাণ পৌঁছানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা আছে প্রশাসনের। হবিগঞ্জ : টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। 

পরে একে একে লস্করপুর, লামাতাসি ও পইল ইউনিয়নের অন্তত ৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। দুর্ভোগে পড়েন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। বন্যার পানি কমায় রাস্তাঘাট ফসলি জমি ও মাছের ঘের শুকিয়ে যাচ্ছে। ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন। সদর উপজেলার হাতিরথান গ্রামের বাসিন্দা রানু বেগমের কুঁড়েঘরটি বন্যায় বিধ্বস্ত হয়। তিনি বলেন, আমি অসহায় নারী। দিনে আনি দিনে খাই। আমার ঘরে অসুস্থ বৃদ্ধ মা ও ছেলে। সব হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব।  একই এলাকার সেলিনা বেগম জানান, বন্যার পানিতে তার ঘরের মাটির ওয়াল ধসে পড়েছে। চার মেয়েকে নিয়ে কষ্টে আছেন। কৃষক মতি মিয়া বলেন, বন্যার পানিতে আমার আউশ ধানের জমি নষ্ট হয়ে গেছে। জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।