গণতন্ত্রে একটি নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে। জনগণের কাছে সব রাজনৈতিক দল তাদের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে। জনগণের কাছে যে দলের কর্মসূচি গ্রহণযোগ্য মনে হয়, ভোটাররা সেই দলকে নির্বাচিত করে। জনগণের ভোটে বিজয়ী দলের প্রধান কাজ হলো সেই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ৩১ দফা কর্মসূচি নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হয়েছিল। জনগণ ৩১ দফার পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন বিএনপির প্রধান কাজ হলো ৩১ দফা কর্মসূচির আলোকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
আশার কথা, গত পাঁচ মাসে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার সেই কর্মসূচির আলোকে দেশ পরিচালনা করতে শুরু করেছে। কিন্তু একটি সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য কেবল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার আন্তরিক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়। এজন্য দরকার সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থার সমন্বয় এবং সহযোগিতা। সরকার একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি। একটি সরকার তখনই সফল হয় যখন সরকারের প্রতিটি শাখা-প্রশাখা তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণে একসঙ্গে কাজ করে। সরকারের একটি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান সরকারের সব অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে। তাই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে তাদের মতো করে প্রশাসন ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢেলে সাজায়। যেন তারা সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এখানে যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি তাঁর মতো করে গোটা সরকারব্যবস্থা নতুন করে সাজান। ব্রিটেনেও বিজয়ী দল তাদের মতো করে প্রশাসনিক পরিবর্তন করে। প্রশাসনিক এই পরিবর্তন বা ঢেলে সাজানো মানে দলীয়করণ নয়, বরং যোগ্যদের দিয়ে সরকারের জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের পথনকশা। সরকারের ভিতরে যদি এমন লোকজন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসে থাকে যারা সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে বিশ্বাসী নয়, যাদের অন?্য কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা আছে তাহলে তারা সরকারের ভালো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। সরকারের অভিপ্রায়ের বিপরীতে কাজ করে। এর ফলে সরকার আন্তরিক হলেও তাদের ভালো কাজের সুফল জনগণ পায় না। সরকারের কথা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের নির্বাচিত সরকার। সরকারের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা লোকজন যেন সরকারের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করছে। এরা সরকারকে বিব্রত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সরকারের ভিতরেই বসবাস করছে শত্রুরা। বিএনপি সরকারের অন্যতম নির্বাচনি অঙ্গীকার হলো- দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। একটি আত্মনির্ভর এবং টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। দেশের অর্থনীতির শতকরা নব্বই শতাংশই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইউনূস সরকারের দেড় বছরের অপশাসনে বেসরকারি খাত এখন শোচনীয় অবস্থায়। হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে আজগুবি হত?্যা মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করা হয়েছে। তদন্তের আগেই বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অসত্য অভিযোগ এনে তাদের সামাজিক এবং ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে ব?্যবসায়ীদের চরিত্রহননের চেষ্টা করা হয়েছে। বহু ব্যবসায়ী ইউনূসের অত?্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ব?্যবসা- বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছেন। ইউনূসের দেড় বছরে কোনো নতুন বিনিয়োগ হয়নি।
কয়েক লাখ মানুষ নতুন করে বেকার হয়েছেন। বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল এমনই এক উদ্বেগজনক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে। এ কারণেই তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেই অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বন্ধ কলকারখানা চালু করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। বেসরকারি খাতের আস্থা ফেরাতে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জন্য সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারের প্রথম বাজেটে বেসরকারি খাত যেন ঘুরে দাঁড়ায় সেজন্য একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। সরকার যখন বেসরকারি খাতকে সচল করতে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে তখন সরকারের ভিতরে থাকা অপশক্তি বেসরকারি খাতের গলা টিপে ধরার নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন, দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব শিল্প গ্রুপকে নতুন করে হয়রানির নীলনকশা তৈরি করেছে।
স্কয়ার, বসুন্ধরা, হা-মীম, যমুনা, পারটেক্স, আকিজ, সিটি, ইউনাইটেড, প্রাণ- আরএফএল, ওয়ালটন, ট্রান্সকম গ্রুপসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তের নামে নতুন করে হয়রানি শুরু করেছে। গত ১৪ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশন এক চিঠিতে বলেছে, ‘বাংলাদেশের কতিপয় বড় বড় গ্রুপ অব কোম্পানিজের বিরুদ্ধে প্রকৃত তথ্য গোপন করে বিভিন্ন কোম্পানির একাধিক অডিট রিপোর্ট তৈরি করে ব?্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে জমা দিয়ে শত শত কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রয়েছে।’ এই কল্পিত অভিযোগ তদন্তের জন্য দুদক বিগত ১০ বছরের (২০১৫ থেকে ২০২৫) ফাইন্যান্সিয়াল/অডিট রিপোর্ট চেয়েছে। বেশ কয়েকটি কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনের এই চিঠি উদ্বেগজনক এবং অত্যন্ত আপত্তিকর। প্রথমত, এখন দুদকের কমিশন নেই। নতুন কমিশন গঠনের জন্য সরকার সম্প্রতি একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছে। দুদকের আইন অনুযায়ী এ ধরনের অনুসন্ধান, তদন্ত একমাত্র কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে করা যায়। বিগত পাঁচ মাস কমিশন নেই। ড. আবদুল মোমেনের নেতৃত্বে কমিশন এ ধরনের তদন্তের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
তাহলে আইন লঙ্ঘন করে কর্তৃত্ববহির্ভূতভাবে এরকম তদন্ত কার নির্দেশে? এটি সুস্পষ্ট দুদকের আইনের লঙ্ঘন। বর্তমান আইনে কমিশন ছাড়া দুদকের কিছু করার এখতিয়ার নেই। কারা এই এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করেছে? যারা করেছে তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, যখন সরকার বেসরকারি খাতে গতি ফেরাতে বাজেটে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ঠিক তখনই দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মহলের এই তৎপরতা কি সরকারের উদ্যোগ ভেস্তে দেওয়ার জন্য? তৃতীয়ত, যখন নতুন কমিশন গঠন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে তখন তড়িঘড়ি করে দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অযাচিতভাবে হয়রানির উদ্দেশ্য কী? সর্বশেষ, কীসের ভিত্তিতে এই অভিযোগ? এই একটি ঘটনা বলে দিচ্ছে সরকারের ভিতরেই সক্রিয় রয়েছে শত্রু। যারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য নানানরকম ষড়যন্ত্র করছে। শুধু দুদক নয়, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভিতরে থাকা সরকারের লোকজন সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছে। এরা ঘরের শত্রু বিভীষণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এখনো প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে এমন সব লোকজন, যারা শুধু বিএনপির মতাদর্শের বিরোধী নন, বিগত নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। এখন তারাই ভোল পালটে ফেলেছেন। বাইরে এরা যতই এখন শহীদ জিয়ার সৈনিক সাজুক না কেন, তারা বিএনপির ক্ষতি করার চেষ্টা করবে সুযোগ পেলেই।
২০২৪ সালের পাঁচ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের তিন দিন পর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ইউনূস ক্ষমতা নিয়েই সর্বস্তরে ব্যাপক পরিবর্তন করেন। প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে নিম্ন আদালতের বিচারক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব থেকে সহকারী সচিব, পুলিশের আইজি থেকে থানার ওসি- সব পর্যায়ের রদবদল করা হয়েছিল। ইউনূস সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা।
সেজন্য তিনি এমনভাবে সবকিছু সাজিয়েছিলেন যাতে নির্বাচনের পক্ষে কেউ কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে না থাকে। এসব রদবদল করা হয়েছে দুটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের তালিকা অনুযায়ী। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা সচিবালয়ে অবস্থান করতেন, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী রদবদল করা হতো। অনেক উপদেষ্টা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জেলা প্রশাসক থেকে সচিব পর্যন্ত পদায়ন দিতেন। টাকার বিনিময়ে পদায়ন ছিল ইউনূস সরকারের সময়ে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এসব নিয়ে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলেও অন্তর্বর্তী সরকার সেসবকে পাত্তা দেয়নি। বরং লোকদেখানো তদন্ত কমিটি করে সব দুর্নীতিকে বৈধতা দিয়েছে। তাই ইউনূস সরকারের আমলে যারাই বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের সততা এবং যোগ্যতা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
তার চেয়েও বড় কথা হলো- এমনভাবে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাজানো হয়েছিল যেন বিএনপি কোণঠাসা থাকে। এই প্রশাসন পাঁচ মাসেও পুরোপুরি পরিবর্তন করা হয়নি। ফলে মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য, এনবিআরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন যারা সরকারের বিরুদ্ধে নীরবে ষড়যন্ত্র করছে। এখনই এদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে ঘরের ইঁদুর বাঁশ কাটবে। এই সরকারকে সফল হতে হলে শক্রদের এখনই চিহ্নিত করতে হবে। শত্রুর সঙ্গে বসবাস করে বিএনপি কীভাবে ৩১ দফা বাস্তবায়ন করবে?