তুচ্ছ ঘটনা, পূর্বশত্রুতা, আধিপত্যের লড়াই, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব-ঘটনা যাই হোক না কেন ছোড়া হচ্ছে একের পর এক গুলি। কথায় কথায় ফিল্মি স্টাইলে ট্রিগার চাপার এসব ঘটনায় প্রাণহানি, হতাহত ও জনমনের আতঙ্ক দিনদিন বেড়েই চলেছে। সেই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের এমন ঝনঝনানিতে প্রশ্নের মুখে পড়ছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। একাধিক সূত্র বলছে, সরকার ঘোষিত বিশেষ অভিযান সেভাবে কার্যকর না হওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা। কাউকে পথের কাঁটা মনে হলেই শার্প শুটার পাঠিয়ে করা হচ্ছে টার্গেট কিলিং। নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলতে ইতোমধ্যে থানা পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দলে ভিড়েছে। এতে নতুন করে ঢাকায় অবৈধ অস্ত্রের চালান বাড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দ্রুতই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আরও বিপর্যয় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে গোয়েন্দারা। ঝুঁকি বিবেচনায় সাঁড়াশি অভিযান জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বাংলাদেশে অবৈধ অস্ত্র সবসময় ছিল। কিন্তু এর ব্যবহার নির্ভর করেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। পট পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এ ছাড়াও লুটের অনেক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়ায় অস্ত্রের ঝনঝনানিতে হুমকি তৈরি করেছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে- অভিযান জোরদার করে অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ, বিক্রেতা ও ক্রেতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনো অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য বিজিবিকে আরও সক্রিয় করতে হবে।
দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আধিপত্য বিস্তারে পেশি শক্তির লড়াই কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এদিকে সম্প্রতি একটি সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসে, রাজধানীতে রয়েছে ৪০১ অবৈধ অস্ত্রধারী। তাদের কাছে রয়েছে ২ সহস্রাধিক অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদ। খুন, চাঁদাবাজি, দখলসহ ভয়ংকর সব অপরাধে এসব অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে এ তালিকায় নাম থাকা অস্ত্রধারীদের হদিস পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যারা গুলাগুলিতে জড়াচ্ছে তাদের অনেকেই নতুন মুখ। অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণকারী তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীরাই তাদের দলে নতুন সদস্য ভিড়িয়ে শার্প শুটার হিসেবে গড়ে তুলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ৬ মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) সারা দেশে অস্ত্র আইনে ৯৮৬টি মামলা হয়েছে। আর গত বছর সারা দেশে মামলা দায়ের হয় ১ হাজার ৮১৫টি। গত ১ মে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান শুরুর পর এ পর্যন্ত ২১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৮৫ অবৈধ অস্ত্রধারী। তবে থানা ও কারাগার থেকে লুটের ১ হাজার ৩২৮ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। ডিএমপির পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ৫ মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অস্ত্র আইনে ৯০টি মামলা দায়ের হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ৮৬টি আগ্নেয়াস্ত্র।
একাধিক সূত্র বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণকারী শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কয়েক হাজার অস্ত্র মজুত করে রেখেছে। মিরপুর এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখতে সম্প্রতি অস্ত্রের মজুত বাড়িয়েছে ফোর স্টার গ্রুপ। অস্ত্র কেনা হচ্ছে সীমান্তে অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত গ্রুপগুলো থেকেই। এলাকা ভাগ করে চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা, ফ্ল্যাট ও প্লট দখল, মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে মামুন, শাহাদাত হোসেন, কিলার ইব্রাহিম ও মোক্তার হোসেনের দুই শতাধিক ক্যাডার। এদের মধ্যে পল্লবী এলাকায় মফিজুর রহমান মামুন এবং তার দুই ভাই মশিউর রহমান মশু ও জামিল নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দুর্ধর্ষ শুটার টিম।
অস্ত্র মজুত রাখতেও বিশেষ কৌশলী এ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগীরা। কিশোর গ্যাং সদস্যদের দলে ভিড়িয়ে তাদের জিম্মায় দেওয়া হয় অস্ত্র। যখন কেউ চাঁদা দিতে রাজি না হয়- তখন বাসা লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি করে ভয় দেখাতে দায়িত্ব দেওয়া হয় কিশোর সদস্যদের। ফাঁকা গুলি করার সাফল্য দেখে শার্প শুটার হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এরপর দেওয়া হয় টার্গেট কিলিংয়ের দায়িত্ব। এ গ্রুপে কিশোর সন্ত্রাসী সাপ্লাই দিচ্ছে কিশোর গ্যাং লিডার পলাশনগরের কিলার আশিক। তার গ্যাংয়ে দেড় শতাধিক সদস্য রয়েছে। যারা কিলার আশিকের বিশ্বস্ত হতে পারে- শুধু তারাই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ছাঁয়ায় যেতে পারে।
সূত্র বলছে, শীর্স সন্ত্রাসীদের গ্রুপের হয়ে কাজ শুরু করার পথ সহজ। কিন্তু কেউ চাইলেই আর বের হতে পারে না। বিশ্বস্ততা প্রমাণে বাধ্যতামূলকভাবে রাখতে হয় অবৈধ অস্ত্র। যা হাতছাড়া হলে কিংবা কখনো গ্রেপ্তার হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে মুখ খুললে নেমে আসে ভয়ানক পরিণতি। প্রাণে বেঁচে থাকতে গ্যাং লিডারদের নির্দেশ মানতে ভয়াবহ অপরাধ করতে বাধ্য হচ্ছে সহযোগীরা। পল্লবী এলাকার মাদকের গডফাদার ল্যাংড়া রুবেলের দলের হয়ে কাজ করেন হৃদয় এলাইস গন্ডার। মাদক কারবার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করায় গত ৯ জুন হৃদয়কে গুলি করা হয়। প্রাণে বাঁচলেও ভয়ে এ ঘটনায় হৃদয় থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। উল্টো আবার অপরাধজগতেই ফিরেছে সে। জানা গেছে, পল্লবীর ৩৮ নম্বর ক্যাম্পে ল্যাংড়া রুবেলের মাদকের রাজত্ব চলছে। আধিপত্য বজায় রাখতে তারও রয়েছে শুটার বাহিনী ও অবৈধ অস্ত্রের মজুত। এ ছাড়াও শীর্ষ সন্ত্রাসী হাবিবুর রহমান তাজ মিরপুর ১০ নম্বর সেকশন, শেওড়াপাড়া ও কাফরুল এলাকার আধিপত্য বজায় রাখতে নিয়মিত অবৈধ অস্ত্রের মজুত বাড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, মিরপুরের ফোর স্টার গ্রুপ ছাড়াও মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, নিউমার্কেট এলাকা নিয়ন্ত্রণে সানজিদুল ইসলাম ইমন ও পিচ্চি হেলালের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কয়েক শত অস্ত্র। ধারণা করা হয়- শুধু মোহাম্মদপুরেই ৯ শতাধিক অবৈধ অস্ত্র রয়েছে বিভিন্ন গ্রুপের হাতে। যাত্রাবাড়ী এলাকার শুটার লিটন বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তার স্ত্রীর দিকনির্দেশনায় মাদক কারবার ও চাঁদাবাজি করছে অস্ত্রধারী সহযোগীরা। বাড্ডার দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী মাহবুব ও মেহেদী এবং মতিঝিল খিলগাঁওয়ের জিসান আহমেদের গ্রুপের রয়েছে শতাধিক অস্ত্রধারী। পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, যেকোনো অস্ত্র-সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি এবং অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। যেসব ঘটনায় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র বা প্রশিক্ষিত শুটারের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়,
সেগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গনি বলেন, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার সহনীয় পর্যায়ে আছে বলেই আমরা মনে করি। যতটুকু ব্যবহার হচ্ছে দ্রুতই কাটডাউন করা সম্ভব হবে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার বহুমাত্রিক কৌশল তৈরি হয়েছে। অনলাইনে ক্লোজ গ্রুপ খুলে সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে। সীমান্ত পেরিয়েও অস্ত্র আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব অস্ত্র উদ্ধার ও প্রবাহ কমাতে র্যাব সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।