Image description

দুপুরের পর খানিকটা রোদ নেমেছে বাকলজোড়া গ্রামের ছোট্ট কবরস্থানে। একটি কবরের পাশে চুপচাপ বসে আছেন মিছিলি বেগম। কখনো কবরের মাটি ছুঁয়ে দেখেন, কখনো ছেলের একটি পুরোনো জামা বুকে জড়িয়ে নেন। দুই বছর পেরিয়ে গেছে। তবু তার বিশ্বাস হয় না একমাত্র ছেলে জাকির হোসেন আর কোনো দিন ফিরে আসবে না।

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বাকলজোড়া ইউনিয়নের বাকলজোড়া গ্রামের বাসিন্দা জাকির হোসেন (২৪) চব্বিশের আন্দোলনে ২১ জুলাই ঢাকার কাঁচপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। জুলাই আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষের মধ্যে কাজ শেষে সহকর্মীদের সঙ্গে নাশতা করতে গিয়ে গুলির শিকার হন তিনি।

জাকিরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের কবরের পাশেই বসে আছেন তার মা মিছিলি বেগম। কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি।

মিছিলি বেগম বলেন, ছোটবেলায় ওকে রেখে মানুষের বাসায় কাজ করতে যেতাম। রাস্তায় রাস্তায় ভাঙারি কুড়িয়ে, মানুষের বাসায় কাজ করে ছেলেটাকে বড় করেছি। ভাবছিলাম, এবার দুঃখের দিন শেষ হবে। কিন্তু একটা গুলি আমার সবকিছু শেষ করে দিল।

জাকিরের বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন মারা যান তার বাবা ফজলু মিয়া। নিজের কোনো জমিজমা ছিল না। স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে রাজধানীর বাড্ডা নতুন বাজার এলাকায় চলে যান মিছিলি বেগম। সেখানে মানুষের বাসায় কাজ, আর ফাঁকে ফাঁকে ভাঙারি কুড়িয়ে কোনোমতে চলত তাদের সংসার।

ছেলে একটু বড় হলে মায়ের সঙ্গে ভাঙারি কুড়াত। পরে দিনমজুরের কাজ শুরু করে। কয়েক বছর ধরে ঠিকাদারের অধীনে ওয়াসার পানির লাইন মেরামতের কাজ করছিলেন কাঁচপুর এলাকায়। দৈনিক মজুরির সেই আয়েই ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছিল তাদের জীবন।

মিছিলি বেগম বলেন, ছেলে বলত,  মা, আর কষ্ট করতে হবে না। কিছু টাকা জমিয়ে গ্রামের বাড়িতে ১৫ শতক জমি কিনেছিল। সেখানে একটা ঘর তুলব, এই ছিল আমাদের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।

মিছিলি বেগমের ভাষ্য, জুলাই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর কয়েক দিন ধরেই জাকির বাসায় ফিরছিলেন না। ফোনে বলতেন, রাস্তাঘাট নিরাপদ নয়, গুলি চলছে। ২১ জুলাই বিকালে কাজ শেষে সহকর্মীদের সঙ্গে পাশের একটি চায়ের দোকানে যান। দোকানের সামনে পৌঁছাতেই একটি গুলি তার পিঠে লাগে। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে একটি গলিতে গিয়ে পড়ে যান। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

সেদিন রাতেই সহকর্মীরা জাকিরের লাশ নিয়ে যান বাড্ডার বাসায়। এরপর মিছিলি বেগম ছেলের লাশ নিয়ে রওয়ানা দেন গ্রামের বাড়ির পথে। পরদিন সকালে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয় সেই জমিতেই, যেখানে একদিন থাকার জন্য একটি ঘর নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন মা-ছেলে।

মিছিলি বেগম বলেন,  যে জায়গায় ঘর করার কথা ছিল, সেই জায়গাতেই এখন আমার ছেলে ঘুমিয়ে আছে। আমি প্রায় প্রতিদিন ওর কবরের কাছে এসে বসে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি ফিরে আসবে। মিছিলি বেগম শান্ত গলায় বলেন,  সবই আছে, শুধু আমার ছেলেটা নেই। ও যদি ফিরে আসত, আমার আর কিছু লাগত না।

জাকিরের খালাতো ভাই এন্টাস মিয়া বলেন, আন্দোলনের সময় জাকির নিয়মিত ফোন করে আত্মীয়স্বজনকে সাবধানে চলাফেরা করতে বলতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেই আর ফিরে আসতে পারেননি। খালার পৃথিবীটা ওকেই ঘিরে ছিল। এখন সেই পৃথিবীটাই শূন্য হয়ে গেছে।

প্রতিবেশী হাবিবুর রহমান বলেন, মিছিলি বেগমের জীবনটাই সংগ্রামের। স্বামীকে হারানোর পর ছেলেকে মানুষ করতে যা কষ্ট করেছেন, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। সেই একমাত্র ছেলেকেও হারিয়েছেন। এখন তিনি একেবারেই একা।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান, জুলাই আন্দোলনে নিহত জাকিরের পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তার আওতায় একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। তার মায়ের নামে ১০ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) করা হয়েছে। এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে।