ফুটবল কখনো কখনো বয়সের হিসাব ভুলে যায়। জন্মসনদ তখন নিছক একটি কাগজ। অভিজ্ঞতার অঙ্ক অর্থহীন। বলটি যখন লামিন ইয়ামালের বাঁ পায়ে এসে থামে, মনে হয় ফুটবল নিজেই একটু থেমে দেখতে চায়,ছেলেটি এবার কী করে!
স্পেন যদি রঙের ক্যানভাস হয়, ইয়ামাল তার সবচেয়ে দুরন্ত তুলির আঁচড়। স্পেন যদি কবিতা হয়, এই কিশোর তার বাঁ পায়ে লেখা বিস্ময়ের পঙ্ক্তি। আর বিশ্বকাপ যদি তারকাদের মহাকাশ হয়, সেখানে বয়সে ছোট্ট একটি নক্ষত্র এখন আলোয় আলোয় বড়দের পথ দেখাচ্ছে।
গ্যালারিতে হাজারো মানুষ। সামনে পৃথিবীর সেরা ডিফেন্ডাররা। কাঁধে একটি দেশের প্রত্যাশা। অথচ ইয়ামালের চোখেমুখে ভয় নেই। যেন পাড়ার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে নেমেছেন। একটি ড্রিবল, শরীরের সামান্য দোল, তারপর বাঁ পায়ের জাদু,ডিফেন্ডার বুঝে ওঠার আগেই ফুটবল অন্য গল্প লিখতে শুরু করে।
লামিন ইয়ামাল শুধু ফুটবল খেলেন না, ফুটবলকে দিয়ে ছবি আঁকান। তার বাঁ পা যেন রংতুলি। কখনো সেই তুলিতে আঁকা হয় গোলের ছবি, কখনো এমন একটি পাস, যার শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করে সতীর্থের উল্লাস। কখনো ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে প্রতিপক্ষের রক্ষণে এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেন, যার উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই বল চলে যায় জালে। ফুটবলে কিছু খেলোয়াড় আছেন, বল তাদের পায়ে গেলে দর্শক সামনে ঝুঁকে বসেন।
ইয়ামাল সেই বিরল প্রজাতির একজন। তিনি কী করবেন, তা প্রতিপক্ষ জানে না। অনেক সময় হয়ত ইয়ামাল নিজেও জানেন না। সেখানেই তার ফুটবলের সৌন্দর্য।
২০০৭ সালের ১৩ জুলাই স্পেনের কাতালোনিয়ার এসপ্লুগেস দে লোব্রেগাতে জন্ম। বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোর, মা শেইলা এবানা নিরক্ষীয় গিনির বংশোদ্ভূত। ইয়ামালের শিকড়ে মিশে আছে আফ্রিকার দুই ভূখণ্ড, তার ফুটবল পরিচয় পেয়েছে স্পেনের আকাশে। তিনটি সংস্কৃতির ছায়ায় বেড়ে ওঠা ছেলেটি আজ স্পেনের স্বপ্নের অন্যতম বড় নাম।
শৈশব কেটেছে বার্সেলোনার কাছের রোকাফোন্দায়। বড়লোকের ঝলমলে পৃথিবী নয়, সাধারণ মানুষের জীবন, ছোট ছোট মাঠ আর ফুটবলের পেছনে ছুটে চলা এক শিশুর গল্প। তার গোল উদ্যাপনের ‘৩০৪’ রোকাফোন্দার ডাকঘর এলাকার পরিচয়ের শেষ তিন সংখ্যা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্টেডিয়ামে গোল করেও তাই ইয়ামাল ফিরে যান নিজের শিকড়ে। দুই হাতের আঙুলে তুলে ধরেন ৩-০-৪। যেন বলেন, আমি যত দূরেই যাই, কোথা থেকে এসেছি ভুলিনি।
বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়ায় যখন তার প্রবেশ, তখনও কে জানত এই ছেলেটি এত দ্রুত সময়কে পেছনে ফেলে দেবে! লা মাসিয়া শুধু ফুটবলার তৈরি করে না, ফুটবল ভাবতে শেখায়। বলকে ভালোবাসতে শেখায়। জায়গা বুঝতে শেখায়। কখন পাস দিতে হবে, কখন দৌড়াতে হবে, কখন থামতে হবে সেই শিক্ষা ইয়ামালের সহজাত প্রতিভার সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে এক বিস্ময়।
বার্সেলোনার প্রথম দলের দরজা তার জন্য খুলে যায় এমন এক বয়সে, যখন অনেক কিশোর স্কুলের পরীক্ষা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে। ইয়ামাল তখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চগুলোর একটিতে ডিফেন্ডারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় ফেলে দিয়েছেন।
তাকে দেখে অনেকেই লিওনেল মেসির কথা বলেন। বাঁ পা, বার্সেলোনা, লা মাসিয়া। ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে আসা। তুলনা তৈরির উপাদান অনেক। কিন্তু ইয়ামালকে মেসির ছায়ায় আটকে রাখা তার প্রতি অন্যায়। মেসি মেসি। ইয়ামাল হতে চান ইয়ামাল। একটি মহাকাব্যের পুনর্মুদ্রণ নয়, তিনি লিখছেন নিজের প্রথম সংস্করণ।
তার ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত নির্ভীকতা। বয়স বাড়লে মানুষ অনেক কিছু শেখে, সঙ্গে ভয়ও শেখে। ভুল করার ভয়, হারার ভয়, সমালোচনার ভয়। ইয়ামালের ফুটবলে এখনো সেই ভয় ঢুকতে পারেনি। সামনে একজন ডিফেন্ডার? তিনি এগিয়ে যাবেন। দুজন? তবু চেষ্টা করবেন। জায়গা নেই? জায়গা বানাবেন। দূর থেকে শট নেওয়ার সুযোগ? বাঁ পা কথা বলবে।
২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে পৃথিবী দেখেছিল কিশোরটির সাহস কতটা বড়। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তার বাঁ পা থেকে বেরিয়ে আসা সেই গোলটি ছিল কৈশোরের পক্ষ থেকে অভিজ্ঞতার পৃথিবীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। বল বাঁক নিয়ে জালে ঢুকেছিল, আর ফুটবলবিশ্ব বুঝেছিল ভবিষ্যৎ দরজায় কড়া নাড়ছে না, ভবিষ্যৎ ইতোমধ্যেই ঘরে ঢুকে পড়েছে।
স্পেন ইউরোপের সেরা হয়েছিল। ইয়ামাল? একটি টুর্নামেন্ট শেষ হতে না হতেই তিনি আর ‘ভবিষ্যতের তারকা’ রইলেন না। হয়ে গেলেন বর্তমানের বাস্তবতা।
বিশ্বকাপের মঞ্চ অবশ্য অন্য পৃথিবী। এখানে একটি ভুলের মূল্য কখনো চার বছরের অপেক্ষা। এখানে একটি গোল একটি প্রজন্মকে অমর করে দিতে পারে। এখানে প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে বাড়ে চাপ, প্রতিটি ধাপের সঙ্গে ভারী হয় জার্সি। অথচ ইয়ামালকে দেখে মনে হয়, তার কাঁধে কোনো ভারই নেই।
স্পেনের ফুটবল একসময় ছিল পাসের অন্তহীন সংগীত। জাভি, ইনিয়েস্তা, বুসকেতসরা বলকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করতেন। নতুন স্পেন সেই সংগীতে যোগ করেছে গতি, সরাসরি আক্রমণ আর দুই প্রান্তের আগুন। এক পাশে নিকো উইলিয়ামস, অন্য পাশে ইয়ামাল। মাঝখানে প্রতিভার মেলা। এই স্পেন শুধু বল রাখে না, আঘাতও করে।
ডিফেন্ডার জানেন তিনি বাঁ পায়ে ভেতরে ঢুকতে পারেন। তবু আটকাতে পারেন না। জানেন তিনি পাস দিতে পারেন। তাই পাসের রাস্তা বন্ধ করেন। তখন ইয়ামাল ড্রিবল করেন। ড্রিবলের পথ বন্ধ করলে শট নেন। ফুটবলে সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড় তিনি নন, যার একটি অসাধারণ অস্ত্র আছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক তিনি, যার সামনে অনেকগুলো উত্তর খোলা থাকে।
তার বয়সের ছেলেরা হয়ত গ্যালারিতে বসে বিশ্বকাপের নায়কদের ছবি তোলে। ইয়ামাল নিজেই এখন সেই ছবির মানুষ। তার জার্সি পরে শিশুরা মাঠে যায়। তার ড্রিবল নকল করে। বাঁ পায়ে বল নিয়ে ডান দিক থেকে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। কোনো এক ছোট্ট মাঠে হয়ত আরেকটি শিশু এখন ইয়ামাল হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
একসময় একটি শিশু মেসিকে দেখে স্বপ্ন দেখেছিল। আজ আরেকটি শিশু ইয়ামালকে দেখে স্বপ্ন দেখছে। প্রজন্ম বদলায়। জার্সির নম্বর বদলায়। স্টেডিয়ামের আলো বদলায়। একটি বলের পেছনে ছুটে চলা শিশুদের স্বপ্ন বদলায় না।
বিশ্বকাপের আলো নিষ্ঠুরও। আজ যে নায়ক, কাল তিনিই সমালোচনার মুখ। একটি খারাপ ম্যাচ, একটি মিস, একটি ভুল সিদ্ধান্ত সবকিছু বদলে দিতে পারে। ইয়ামালের সামনেও সেই পথ। তার ক্যারিয়ার এখনো দীর্ঘ। সামনে সাফল্য থাকবে, ব্যর্থতাও আসবে। করতালি থাকবে, সমালোচনাও থাকবে। কারণ ফুটবল কাউকে শুধু ফুলের রাস্তা দেয় না।
কিছু প্রতিভাকে দেখলে মনে হয়, তারা পথের ভয় নিয়ে জন্মায়নি। লামিন ইয়ামাল তেমনই।
তার ফুটবলে এখনো কৈশোরের দুষ্টুমি আছে। ড্রিবলে আছে রাস্তায় ফুটবল খেলা শিশুর স্বাধীনতা। বাঁ পায়ে আছে লা মাসিয়ার শিক্ষা। চোখে আছে বড় স্বপ্ন। আর বুকের ভেতর এমন এক সাহস, যা বয়স দিয়ে মাপা যায় না।
বিশ্বকাপের ট্রফি শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে, ইতিহাস এখনো জানে না। স্পেন কত দূর যাবে, সেই উত্তরও লেখা বাকি। এই বিশ্বকাপ ইতোমধ্যে একটি দৃশ্য মনে রাখবে,বল পায়ে এক কিশোর, সামনে ডিফেন্ডার, গ্যালারি উঠে দাঁড়াচ্ছে। সবাই জানে কিছু একটা ঘটতে পারে। তারপর ইয়ামাল দৌড় শুরু করেন। ফুটবল তখন আর শুধু খেলা থাকে না। হয়ে ওঠে কবিতা। আর সেই কবিতার কিশোর কবি—লামিন ইয়ামাল।