Image description
আইন সংশোধনে ইসির গুচ্ছ প্রস্তাব

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা স্বপদে থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। তাদের কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে চাকরি ছাড়তে হবে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ আইনে এ বিধানসহ এক গুচ্ছ সংশোধনী আনতে সরকারকে প্রস্তাবনা পাঠানোর চিন্তা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

প্রস্তাবে অন্য সংশোধনীগুলোর মধ্যে রয়েছে-জাতীয় সংসদের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসাবে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনের ক্ষমতা ইসির হাতে দেওয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা। ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ও পরিচালকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না দেওয়া। নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠন এবং আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘন করলে সাজা বাড়ানো। ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা’ ও স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আইনের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতেই এসব প্রস্তাবনা। এতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের আইনগুলোতে একই ধরনের বিধান রাখার ওপর জোর দিচ্ছে কমিশন। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে কয়েক দফা বৈঠক করে এসব প্রস্তাবের খসড়াও তৈরি করেছেন ইসির কর্মকর্তারা। চলতি সপ্তাহে এটি সরকারের কাছে পাঠানো হতে পারে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আইনগুলো আমরা রিভিউ করছি। আমরা দেখেছি, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের আইনগুলোতে কয়েকটি বিষয়ে একেক ধরনের বিধান রয়েছে। সব আইনে একই ধরনের বিধান থাকলে ভালো হয়। এ নিয়ে আমরা একটা প্রস্তাবনা তৈরি করেছি। তবে ওই প্রস্তাবনা সরকারের কাছে পাঠানো হবে কিনা তা নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব আইন সংশোধন না হলে নির্বাচন আয়োজন করা যাবে না, এমন নয়। বিদ্যমান আইনেও নির্বাচন করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্টরা জানান, স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের আইনের যে ধারা-উপধারায় ভিন্ন ধরনের বিধান রয়েছে, সেগুলো একই রকম করে প্রস্তাবনা চূড়ান্তের পথে। তবে এ প্রস্তাবনা সরকারকে ইসি পাঠাবে কিনা, তা নিয়ে কমিশনারদের মতপার্থক্য রয়েছে। সরকার এ প্রস্তাব ভালোভাবে গ্রহণ করবে কিনা, এমন আলোচনাও করেছেন কমিশনারদের কেউ কেউ। তারা আরও জানান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করার এখতিয়ার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। তবে ইসি আইন সংশোধনে সরকারকে অনুরোধ জানাতে পারে। অক্টোবরে নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। আইনে এসব বিধান যুক্ত করতে হলে সংসদে সংশোধনী পাশের প্রয়োজন হবে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অযোগ্যের বিধান : জানা গেছে, ইসির পর্যালোচনায় যেসব সংশোধনী উঠে এসেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো-স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা। এজন্য প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা সংক্রান্ত স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনের ধারা ২৩(১), স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইনের ধারা ১৯(ঙ), স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের ধারা ৯(ঙ), উপজেলা পরিষদ আইনের ধারা ৮(ঙ) এবং জেলা পরিষদ আইনের ধারা ৬(ঙ) এ সংশোধনী প্রয়োজন হবে। এতে ‘প্রজাতন্ত্রের পরিষদের বা কোনো সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের কর্মে কোনো লাভজনক পদে বা কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পদে সার্বক্ষণিক অধিষ্ঠিত থাকেন’ শব্দগুলো যুক্ত করার প্রস্তাব করার পরিকল্পনা নিয়েছে ইসি। এ সংশোধনী এলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সাত লাখ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।

ইসির সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালার ১১.১৭ (ক) ও (খ) এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওই প্রস্তাব করা হচ্ছে। নীতিমালা অনুসারে, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক পদে, চাকরিতে বা আর্থিক লাভজনক পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। যদি কেউ তা করেন, তদন্তে প্রমাণিত হলে সরকার তার এমপিও বাতিলসহ বিধি মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে। এতে আরও বলা হয়েছে, নীতিমালায় আর্থিক লাভজনক পদ বলতে সরকারের দেওয়া কোনো ধরনের বেতন, ভাতা, সম্মানি এবং বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিকতা বা আইন পেশায় কর্মের বিনিময়ে বেতন, ভাতা বা সম্মানিকে বোঝাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সার্কুলারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ প্রস্তাব করা হচ্ছে। এছাড়া নির্বাচনে শিক্ষকরা প্রিসাইডিং, সহকারি প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকরা নির্বাচনে প্রার্থী হলে সহকর্মীদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী : আরও জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আদলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনি আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী শব্দ যুক্তের প্রস্তাব করতে চায় ইসি। এ বিধান যুক্ত হলে পুলিশ, র‌্যাব, আনসার ও বিজিবির পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নির্বাচনি দায়িত্বে সরাসরি মোতায়েন করতে পারবে কমিশন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই বিধান অনুযায়ী তিন বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।

এ বিধান যুক্তের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে একজন নির্বাচন কমিশনার জানান, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসি সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ওই নির্বাচনে সেনা মোতায়েনে অস্বীকৃতি জানায় এবং একপর্যায়ে সেনা মোতায়েনও করেনি। এ কমিশনার বলেন, আইনে সশস্ত্র বাহিনীর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলে নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের ক্ষমতা ইসির কাছে থাকবে। সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হবে না।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় সংসদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই বিধান চিন্তা করা হচ্ছে।

অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জশিট হলে ভোটে অযোগ্য : জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে ওই ব্যক্তিকে নির্বাচনে অযোগ্য করার বিধান আইনে যুক্ত করার প্রস্তাব করতে চায় ইসি। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ২০ ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে এ উদ্যোগ। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান আইনে এ ধরনের কোনো বিধান নেই। এটি নতুন করে যুক্ত করা প্রয়োজন হবে। তবে সংসদ নির্বাচনের আইন আরপিওতে এ ধরনের বিধান রয়েছে।

অন্যান্য : এছাড়াও ইসির প্রস্তাবনায় যেসব সুপারিশ রয়েছে, তার একটি হচ্ছে, নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল ও নির্বাচনি আপিল ট্রাইব্যুনাল বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠন করা। বর্তমানে আপিল ট্রাইব্যুনালে নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তারাও থাকেন। ইসির প্রস্তাবে শুধু বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের ঘটনায় ৬ মাস কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আইনে যুক্ত করতে চায় ইসি। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ আইনে ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও ছয় মাস কারাদণ্ডের কথা উল্লেখ আছে। অথচ ইসির প্রস্তাবিত আচরণ বিধিমালায় ৬ মাস কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা উল্লেখ করেছে।

এছাড়া ঋণখেলাপি কোম্পানি বা ফার্মের অংশীদার ও পরিচালকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য করে বিধান আইনে যুক্ত করার প্রস্তাব করতে চায় ইসি। বর্তমানে শুধু ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অযোগ্য। পাশাপাশি হলফনামায় অসত্য তথ্য দিলে তার প্রার্থিতা বাতিলের বিধানও যুক্ত চায় কমিশন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আমাদের অলোচনায় অনেক বিষয় রয়েছে। উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আয়করের রিটার্ন জমা দেওয়া ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সময়সীমা প্রসঙ্গে একেক আইনে একেক ধরনের বিধান রয়েছে। আমরা এসব বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করছি।