Image description

বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর ও নেত্রকোনার মতো জেলাগুলোতে পাসপোর্ট করতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের ধরা পড়ার ঘটনা এই ভয়াবহতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

এক সৌদি আরবেই ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা থাকার কথা জানিয়েছে ওই দেশের সরকার। তালিকার বাইরেও সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি পরিচয়ে রয়েছে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। সংঘবদ্ধ দালালচক্র, স্থানীয় অসাধু জনপ্রতিনিধি এবং তথ্যের সঠিক যাচাই-বাছাইয়ের অভাবে রোহিঙ্গারা সহজেই সংগ্রহ করছে জন্ম নিবন্ধন সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র। এই পরিস্থিতি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

গত বছরের ১ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের সময় ধরা পড়েন আজিজ খান নামের এক রোহিঙ্গা যুবক। নিজেকে ‘হাফেজ আব্দুল আজিজ’ পরিচয় দিয়ে তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে প্রবেশ করা এই যুবক দালালের মাধ্যমে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন সনদ ও মা-বাবার নাম ব্যবহার করে পাসপোর্ট পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের তৎকালীন উপপরিচালক শামীম আহমেদ বলেন, ‘বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে আঙুলের ছাপ মেলাতে গিয়েই তার জালিয়াতি ধরা পড়ে।

একইভাবে চাঁদপুরে ধরা পড়েছেন দুই রোহিঙ্গা নারী, যাঁরা বাংলাদেশি সেজে সৌদি আরবে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তাঁরা স্বীকার করেছেন যে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দালালরা তাঁদের সব কাগজপত্র তৈরি করে দিয়েছে। 

অন্যদিকে নেত্রকোনায় ধরা পড়া মো. করিম নামের এক রোহিঙ্গার কাছে সৌদি আরবের ড্রাইভিং লাইসেন্সও পাওয়া গেছে। তিনি চট্টগ্রাম থেকে বাসযোগে সম্প্রতি নেত্রকোনায় এসেছিলেন পাসপোর্ট করার উদ্দেশ্যে। ভাষাগত জটিলতার কারণে ধরা পড়েন তিনি।

নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম  গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, আটকের পর তার (করিম) কথা বোঝা যাচ্ছিল না। পরে চট্টগ্রামের একজনের মাধ্যমে তার কথা বোঝা যায়। পরে তাকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে। 

পাসপোর্ট পাওয়ার প্রধান শর্ত হলো জন্ম নিবন্ধন সনদ বা এনআইডি। দালালরা এই জায়গাটিকেই সবচেয়ে বেশি টার্গেট করে। প্রতিটি পাসপোর্টের বিনিময়ে তারা ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার জনপ্রতিনিধি বা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা যাচাই-বাছাই ছাড়াই টাকার বিনিময়ে জন্ম নিবন্ধন সনদ ও নাগরিকত্ব সনদ প্রদান করছেন।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, অতীতে জালিয়াতি করা সহজ ছিল। ই-পাসপোর্ট চালু হওয়ার পর জালিয়াতি অনেক কমেছে। তবে সমস্যা হচ্ছে প্রাথমিক নথিপত্রে। যদি কোনো ব্যক্তি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্ম নিবন্ধন সনদ বা এনআইডি নিয়ে আসে, তবে পাসপোর্ট অফিসের পক্ষে অনেক সময় তার প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে, যদি না তার বায়োমেট্রিক ডেটা আগে থেকে রোহিঙ্গা হিসেবে সংরক্ষিত থাকে।

রোহিঙ্গাদের এই পাসপোর্ট জালিয়াতির সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশের মাটিতে রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশি পরিচয়ে কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তার দায়ভার গিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের ভিসা দিতে আরো বেশি কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে, যা দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তা করতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ সারা দেশে একটি বিশাল সিন্ডিকেট সক্রিয়। সম্প্রতি এই চক্রের ২৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই সিন্ডিকেটে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি দালালদের পাশাপাশি কিছু অসাধু আনসার সদস্যের নামও উঠে এসেছে।

গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য মতে, তারা কয়েকটি ধাপে কাজ করে। একটি গ্রুপ টেকনাফ বা কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে আসে। দ্বিতীয় গ্রুপটি বিভিন্ন জেলার ঠিকানা ব্যবহার করে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন সনদ ও এনআইডি তৈরি করে। তৃতীয় গ্রুপটি পাসপোর্ট অফিসের আনসার সদস্যদের সহায়তায় বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলার কাজ সম্পন্ন করে। এই কাজের জন্য তারা এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়। অনেক রোহিঙ্গা তাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা স্বর্ণালংকার বিক্রি করে এই টাকা জোগাড় করে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইল ফোনে কয়েক শ পাসপোর্ট ডেলিভারি স্লিপ এবং জাল নথিপত্র পাওয়া গেছে, যা এই সিন্ডিকেটের ভয়াবহতার সাক্ষ্য দেয়।

কক্সবাজার ও পার্শ্ববর্তী এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ভাষাগত ও শারীরিক মিল থাকায় তারা সহজেই স্থানীয় সমাজের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। গত কয়েক দশকে আসা অনেক রোহিঙ্গা এখন স্থায়ীভাবে জায়গা-জমি ক্রয় করেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বিয়ে করে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করছে। এই সামাজিক সংমিশ্রণ পাসপোর্ট জালিয়াতিকে আরো সহজ করে দিচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জামাল উদ্দিন খন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, পাসপোর্ট জালিয়াতি বন্ধ করতে শুধু পাসপোর্ট অফিসে কড়াকড়ি যথেষ্ট নয়; এর গোড়া কাটতে হবে স্থানীয় পর্যায় থেকে। ইউনিয়ন পরিষদ ও ওয়ার্ড পর্যায়ে জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম চালু করতে হবে। যেকোনো নতুন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে তার বংশপরিচয় ও স্থায়ী বসবাসের প্রমাণের ক্ষেত্রে অন্তত ২০ বছরের রেকর্ড যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডি ডেটা বেইসের সঙ্গে রোহিঙ্গা ডেটা বেইসের স্বয়ংক্রিয় সংযোগ স্থাপন করতে হবে। যেসব জনপ্রতিনিধি বা কর্মকর্তা এই রাষ্ট্রদ্রোহী কাজে লিপ্ত, তাঁদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।