‘চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে, আমার বলার কিছু ছিল না’ না গো; আমার বলার কিছু ছিল না’ (হৈমন্তি শুক্লা)। নির্বাচিত বিএনপি সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-এমপি এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি পাওয়া ব্যক্তিদের নীরবতার সুযোগ নিয়ে তলে তলে সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সুসংগঠিত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম এবং কিছু ব্যক্তি দেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের নানান কৌশল করছে।
এমনকি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে নানাভাবে প্রমোট এবং তার বক্তব্য প্রচার করে ‘জুলাই চেতনার’ বিপক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করছে। এমনকি জাতিসংঘের চোখে ১৪শ’ ছাত্রজনতাকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত মানবাধিকার লংঘনকারী এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামী শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও খুনি হাসিনার বক্তব্য ফলাও করে প্রচার করছে। খুনিকে নিয়ে হৈচৈ অথচ জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের দায়িত্বশীলরা নীরব! মন্ত্রী-এমপিদের নীরবতার সুযোগ নিয়ে ফাঁসির আসামী শেখ হাসিনা দেশি-বিদেশি শক্তিকে ব্যবহার করে যখন দেশে ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটাবে তখন শাসক দলের মন্ত্রী এমপিদের হৈমন্তী শুক্লার ওই ‘চেয়ে চেয়ে দেখলাম ছাড়া করার কিছুই থাকবে না’। ১৪শ’ ছাত্রজনতার রক্তের বিনিময়ে জুলাই অভ্যুত্থান প্রশ্নবিদ্ধের অপচেষ্টা হচ্ছে। অতঃপরও জনগণ ভোটে নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-এমপিরা অতি ‘ক্ষমতার ভোগ বিলাসে’ মহাব্যস্ত। একযুগ আগেও ৮ বছরের সাজাপ্রাপ্ত তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারের উপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা যে গণমাধ্যমগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে; এখন সেই গণমাধ্যমগুলো আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ফাঁসির আসামী শেখ হাসিনার বক্তব্য ফলাও করে প্রচার করছে; অথচ সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ভাবখানা যেন কিছুই ঘটেনি।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক শেখ হাসিনাকে দেশের মানুষ মাইন্যাস করে দিয়েছে দুই বছর আগেই। মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। কিন্তু দিল্লির অনুগত এবং হাসিনার অলিগার্ক গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীরা হাসিনার বক্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফাঁসির পলাতক আসামী শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে হৈচৈ হলেও সরকারের মন্ত্রী এমপিদের ভাবখানা কিছুই হয়নি। তবে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘হাসিনা ফাঁসির রশিতে ঝুলে পড়ার লক্ষ্যে দেশে ফেরার কথা বলেছেন’। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা যদি ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে চাচ্ছেন খবর যদি সত্য হয়, তাহলে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা কেন? শেখ হাসিনা, আপনি এখনই দেশে ফিরে আসুন। বাংলাদেশের জনগণ এবং আদালতের সামনে শেখ হাসিনার অনেক প্রশ্নের জবাব দেয়ার রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণহানির দায়, তার শাসনামলে বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, ‘আয়নাঘর’, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ভোটাধিকার থেকে জনগণের বঞ্চিত হওয়া এবং ভারতের প্রতি বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান এসব বিষয়ে তার ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন।’
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স দিল্লিতে পালিয়ে থাকা ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার এক টেলিফোন সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে। ওই সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তিনি এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন’। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে দুই বছর ধরে জনসম্মুখে দেখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তার প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের ‘সত্য নাকি ফেইক’ যাচাই করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের একজন প্রবীণ সাংবাদিক এম এ আজিজ সংশয় প্রকাশ করেছেন এই বলে যে ‘শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন কিনা তা নিয়ে তার সন্দেহ’। কারণ, তার মতে দুই বছর ধরে হাসিনার অনেক বক্তব্য গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা হলেও কোথাও তাকে দেখা যায়নি। রয়টার্সে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের পর দেশের গণমাধ্যমগুলো যেন মওকা পেয়ে বসেছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামীর বক্তব্য নিয়ে মতামাতি চলছে। তারা শেখ হাসিনার বক্তব্য ফলাও করে প্রচার করে দেশবাসীকে বার্তা দিচ্ছে যে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন। এটা যে দেশে থাকা দলটির নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিগত ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার তিন দফায় শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে দিল্লির কাছে চিঠি লিখেছে; কূটনৈতিক চ্যানেলে ২০১২ সালের বন্দী প্রত্যাবর্তন আইন অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করেছে। ভারত দেয়নি এবং হাসিনাও দেশে ফিরে আসেনি। সেই শেখ হাসিনা এখন দেশে ফিরে ফাঁসির দড়ি গলায় ঝুঁলাবেন! সেটা নিয়ে গণমাধ্যম ফলাও করে খবর প্রচার করছে। অথচ সরকারের দায়িত্বশীলরা ক্ষমতার ভোগ বিলাসে বিভোর! মজার ব্যাপার হলো আদালতের আদেশ অমান্য করে যারা শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে মহাব্যস্ত তারাই সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাছে অতি প্রিয়। সাংবাদিকদের নানা সুযোগ সুবিধা, বিজ্ঞাপন তাদের প্রাধ্যান্য দেয়া হচ্ছে। তাহলে কি সরকারের ভিতরেই হাসিনার অলিগার্ক রয়ে গেছে?
তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর ভারত কোমড় বেঁধে পুশইন-পুশব্যাক কালচার চর্চা শুরু করেছে। বাংলাদেশের পরিযায়ী শ্রমিক ভারতে কাজ করতে গেছে এমন অভিযোগ তুলে কয়েকশ’ মানুষকে বাংলাদেশে পুশব্যাকের চেষ্টা করছে। অথচ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, এমপিসহ হাজার হাজার নেতা ভারতে পালিয়ে গেছেন। তাদের বেশির ভাগই হত্যা, মানবাধিকার লংঘন মামলার চিহ্নিত আসামী। ভারতের কোলকাতা, দিল্লি, আগরতলাসহ বিভিন্ন শহরে তারা বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে; এমনকি কোলকাতায় রাজনৈতিক কার্যালয় পর্যন্ত স্থাপন করেছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশে পুশইন-পুশব্যাক করছে; অথচ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের পুশইন না করে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমগুলোর মাথাব্যথ্যা নেই। এমনকি সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী-এমপিরাও এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করছেন না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে এসব নিয়ে ভারত প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ছিল; কিন্তু নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্করা যেন চিন্তামুক্ত হয়ে গেছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনা ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত। ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারী করে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী কোনো গণমাধ্যমের শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ আদালতের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশের বেশির ভাগ গণমাধ্যম ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার বক্তব্য ফলাও করে প্রচার করছে। অথচ তারেক রহমানের ক্ষেত্রে এই গণমাধ্যমগুলোর ‘উল্টো চেতনা’ দেখা গেছে। শেখ হাসিনার ক্যাঙ্গারু কোর্ট বিএনপির ওই সময়ের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কারাদণ্ড দিয়েছিল। অতঃপর ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি আইনের দৃষ্টিতে তারেক রহমান ‘পলাতক’ থাকার কারণ দেখিয়ে সব গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তার বক্তব্য প্রচার নিষিদ্ধ করে একটি রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। ওই সময় দেখা গেছে দেশের বেশির ভাগ গণমাধ্যম আদালতের রায় অক্ষরে অক্ষরে পালন করে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার থেকে বিরত থাকে। এ
মনকি তারেক রহমান পলাতক এ অজুহাতে তাকে নিয়ে খবর এবং বিজ্ঞাপন পর্যন্ত প্রচার করেনি গণমাধ্যমগুলো। ব্যতিক্রম ছিল দৈনিক ইনকিলাবসহ দু’তিনটি পত্রিকা। ইনকিলাব ঝুঁকি নিয়ে তারেক রহমানের বক্তব্য ভিন্ন আঙ্গিকে বিএনপির নেতাকর্মী ও জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে প্রচার করেছে। পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ে তারেক রহমানের উপর বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে। কিন্তু আজ যারা ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার বক্তব্য ফলাও করে প্রচার করছে তারা তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার করেনি আদালতের নিষেধাজ্ঞার অজুহাতে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর এক রিট আবেদনকারীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারের নিষেধাজ্ঞার রুল খারিজ করে দেয়। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট থেকে বর্তমানে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে কোনো আইনি বাধা নেই।
রয়টার্সে প্রকাশিত শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রচারের পর সেটা দেশের গণমাধ্যম ফলাও করে প্রচার করে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তা প্রচারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। টিভির টকশো, ইউটিউব চ্যানেলের টক শোসহ নানা প্লাটফর্মে শেখ হাসিনার বক্তব্য ছড়িয়ে দেয়া হয়। অতঃপর সরকারের দায়িত্বশীলদের ঘুম ভাঙ্গে। শেখ হাসিনার বক্তব্য যখন সবার কাছে পৌঁছে গেছে তখন খুনি হাসিনার বক্তব্য প্রচার না করতে সকল গণমাধ্যমকে অনুরোধ জানিয়েছে সরকার। গত শুক্রবার রাতে এক তথ্য বিবরণীতে এই অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়, দেশের সকল গণমাধ্যম তথা প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন সংবাদ মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো আদালতের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক অপরাধীর কোনো ধরনের বক্তব্য, সাক্ষাৎকার, অডিও-ভিডিও ভাষণ গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যাপারে আইনগত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, দেশের আইন-শৃংখলা রক্ষার স্বার্থে এবং আদালতের নির্দেশনার প্রতি সম্মান জানিয়ে পলাতক শেখ হাসিনার কোনো প্রকার ভাষণ, বিবৃতি বা বক্তব্য সরাসরি কিংবা ধারণকৃত অবস্থায় কোনো গণমাধ্যমে (টেলিভিশন, বেতার, সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টাল বা সামাজিক মাধ্যম) প্রচার বা প্রকাশ না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, সরকার প্রত্যাশা করে, দেশের সকল গণমাধ্যম, সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং নাগরিকবৃন্দ প্রচলিত আইন ও আদালতের নির্দেশনার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন এবং তা প্রতিপালনে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবেন।
দিল্লির আর্শিবাদে শেখ হাসিনা জনগণের ঘাড়ে চেপে বসেছিল। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। দীর্ঘ ১৫ বছর দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা, জুলুম-নির্যাতন হয়েছে। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিএনপি বছরের পর বছর ধরে আন্দোলনও করেছে। কিন্তু দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে থাকায় দেশের অবস্থানরত দায়িত্বশীল নেতাদের অদূরদর্শিতা ও দোদুল্যমনতায় আন্দোলন সফল হয়নি। এমনকি হাসিনার স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত করতে ২০১৮ সালের রাতের ভোটে বিএনপি যেমন অংশ গ্রহণ করেছে; তেমনি ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশে ব্যাপক হাঙ্গামায় দলের মহাসচিব লক্ষণ সেনের মতো সমাবেশ স্থল থেকে সরে যাওয়ায় আওয়ামী লীগ ও তার বাহিনী আরো মারমুখি হয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের উপর জুলুম নির্যাতন করেছে। তবে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনার গদি নড়বড়ে করে দেয়। এক পর্যায়ে ১৪শ’ ছাত্রজনতাকে হত্যা করে শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে গেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন অতঃপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে ভারত প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিল; ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও দলটির অলিগার্করা গর্তের মধ্যে লুকিয়ে ছিল; বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তারা প্রকাশ্যে চলে আসে। তারা এখন মিছিল করছে, পতাকা উড়াচ্ছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসিনার পক্ষে জনমত গঠনে ঝড় তুলছে। শুধু তাই নয়, ‘জুলাই চেতনা’ নিয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছে। মেহের আফরোজ শওন, মাহিয়া মাহিরা জুলাই চেতনার উপর বিষ্ঠা ছড়াচ্ছে; অথচ সরকার একেবারে নীরব। অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ভোকাল হিসেবে চিহ্নিত সাংবাদিক আনিস আলমগীরসহ কয়েকজনকে নানা অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অথচ আনিস আলমগীর কারাগার থেকে জামিনে বের হলে প্রধানমন্ত্রী নিজেই ফোন করে তার খোঁজ খবর নেন। ফলে হাসিনার অনুগত অ্যাক্টিভিস্টরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন।
দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ নামের ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দলকে মন থেকে মুছে ফেলেছে। যার কারণে রিফাইন আওয়ামী লীগ, পরিচ্ছন্ন আওয়ামী লীগ এবং নেতৃত্বে ক্লিন ইমেজের নেতাদের পদে বসিয়ে আওয়ামী লীগকে সক্রিয় করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। অতঃপর সোশ্যাল মিডিয়া, দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় এবং খুনের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা চলছে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে জনগণের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তোলার রাজনীতি হচ্ছে। অথচ বিএনপি কৃষিকার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন ইত্যাদি নিয়ে মহাব্যস্ত। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ধানি জমির উপর খাল খনন করা হলে পানি কোথা থেকে আসবে সে চিন্তা নেই। দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থা, বিদেশি বিনিয়োগ নেই, বেকারত্ব বাড়ছে, মিল কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অতি বর্ষণ ও উজানের পানিতে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে; সেদিকে খেয়াল নেই।
এমনকি সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ গ্রহণের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছে; সেদিকে বিএনপির ভ্রুক্ষেপ নেই। ‘তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’ হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর মতো ‘বিএনপিকে বধিতে’ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সুসংগঠিত হচ্ছে সেদিকে সরকারের ভ্রুক্ষেপ নেই। অবশ্য জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্যসমন্বয়ক সারজিস আলম বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারকে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী। পলাতক থেকে বিদেশ বসে যারা দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট বা ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করবে, জনগণ তাদের কঠোর জবাব দেবে। শেখ হাসিনা বা তাঁর দোসররা বিদেশে বসে বা অনলাইন মাধ্যমে দেশে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা আর সফল হবে না।