Image description

ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইয়ামিন রহমান। সংগঠনের অফিসিয়াল নাম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নামে পরিচিত তিনি। নিয়মিত শাখা ছাত্রদলের কর্মসূচিতেও অংশ নেন। তবে মো. শাহীন নামে তিনি একই সঙ্গে রাজধানীর মালিবাগে অবস্থিত আবুজর গিফারী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।  

অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেও মো. শাহীন ওরফে ইয়ামিন রহমান এখনও নিজেকে ছাত্রদল নেতা পরিচয়ে আবুজর গিফারী কলেজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছেন। তার ভয়ে তটস্থ কলেজ অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে তার বিভাগের সহকর্মীরাও। ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেন না তারা কেউ। তারা বলছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে মো. শাহীন ওরফে ইয়ামিন রহমানে কর্মকাণ্ড পুরোই সাংঘর্ষিক।

সংশ্লিষ্টরা এ ঘটনাকে অভিযুক্তের কর্মস্থলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, মো. শাহীন ওরফে ইয়ামিন রহমানের ঘটনাটি যেন বাস্তব জীবনের ‘আয়নাবাজি’; যিনি একইসঙ্গে ভিন্ন নামে ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষকতা করেছেন, অথচ সেটি করছেন প্রকাশ্যেই। বিষয়টি জানতে তার সঙ্গে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তার মুঠোফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও ক্ষুদেবার্তায় বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া দেননি তিনি।

ছাত্রদল নেতার আয়নাবাজি 
 

জানা গেছে, মো. শাহীন ওরফে ইয়ামিন রহমান ২০২৩ সালে কলেজটিতে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তার গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলায়। তখন তিনি ভোলা-৩ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের পরিচয় দিতেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। আগে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডে অংশ না নিলেও ৫ আগস্টের পর এখন তিনি ছাত্রদল পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন।

ছাত্রদলের কর্মসূচিতে ইয়ামিন 
 

কলেজের গভর্নিং বড়ির সভাপতির পদ পরিবর্তন থেকে শুরু করে অধ্যক্ষ পদে রদবদলসহ নানা কর্মকাণ্ডে তিনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এজন্য তিনি কলেজে একটা গ্যাং পালেন। দলবল তিনি তিনি এই হস্তক্ষেপ করেন।

জানতে চাইলে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফরিদ আহাম্মদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বিষয়টি আমি জানি। আগে পদে ছিল জানতাম, যুগ্ম আহ্বায়ক কিন্তু এখন পদে আছে কীনা জানা নেই। 

কলেজে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘না, তেমন প্রভাব বিস্তার করেন না তিনি।’ 

‘তেমন’— বলতে কতটুকু প্রভাব বিস্তারের কথা বলছেন, জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, তিনি কোনো প্রভাব বিস্তার করেন না।

কলেজের একজন শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের সাথে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি কীভাবে দেখেন জানতে চাওয়া হলে তিনি দোয়া অনুষ্ঠানে আছেন জানিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে তিনি 
 

বিভাগের চেয়ারম্যান সোবহান খন্দকার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সেটা জানি। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

অব্যাহতি দেওয়া হলেও সক্রিয় ছাত্রদলের কর্মকাণ্ডে
জানা গেছে, মো. শাহীন ওরফে ইয়ামিন রহমান ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আগের কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। বর্তমান কমিটির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত বলে তার সহপাঠীরা জানিয়েছেন।

ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. মিল্লাদ হোসেন বলেন, ইয়ামিন রহমান একসময় কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তবে এখন তিনি আবুজর গিফারী কলেজে শিক্ষকতা করেন। তাই তাকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে।

ফেসবুকে ছাত্রদল নেতা হিসেবেই পরিচিত তিনি 
 

যদিও ইয়ামিন রহমানের ফেসবুকে নিয়মিত শাখা ছাত্রদলের কর্মসূচিতেও অংশ নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এগুলো আগের কর্মসূচির ছবি-ভিডিও।

এদিকে ইয়ামিন রহমানের ফেসবুকে গিয়ে দেখা যায়, সম্প্রতিও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, নৈরাজ্য ও সকল অপতৎপরতার বিরুদ্ধে ছাত্রদল ঢাকা কলেজ শাখার কর্মসূচিতে তাকে সামনের সারিতে দেখা গেছে। এছাড়া ছাত্রদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের ছবি ও ভিডিও রয়েছে।

ছাত্রদলের কর্মসূচিতে মো. শাহীন ওরফে ইয়ামিন রহমান 
 

এর আগে গত জানুয়ারিতে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের ২ জন যুগ্ম আহ্বায়ক ও ১৩ জন সদস্যসহ মোট ১৫ জনকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সংগঠনের ৩ জন সদস্যকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে কেন্দ্রীয় সংসদ। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা জানানো হয়েছিল। ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এই নির্দেশনাসমূহ অনুমোদন করেছেন। অব্যাহতিপ্রাপ্ত নেতাদের মধ্যে ছিলেন যুগ্ম আহ্বায়ক ইয়ামিন রহমানও।

এমপিও নীতিমালায় কী আছে
সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ‘সরকারি চাকুরি বিধিমালা-২০১৮’ এবং ‘সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা-১৯৭৯’ মেনে চলেন। আচরণবিধি না মানলে সরকারি চাকরিজীবীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তবে দেশে পাঁচ লাখের কাছাকাছি এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী শৃঙ্খলা পরিপন্থী অপরাধ করলে তাদের সুনির্দিষ্ট বিধিমালায় শাস্তি দেওয়া যায় না। ২০২৪ সালে তাদের জন্য আলাদা বিধিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। 

বাংলাদেশেরঅর্থনীতি রিপোর্ট

 

চীন সফর শেষে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা রুয়েলকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান তিনি 
 

তখন ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আচরণবিধি ও শৃঙ্খলা বিধিমালা’র খসড়া প্রস্তুতও করেছিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। তবে সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। তবে খসড়া বিধিমালায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সাধারণ আচরণ ও শৃঙ্খলা শিরোনামে ১০টি বিধি ছিল। এর একটিতে বলা হয়েছে, ‘কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেবেন না, এর সাহায্যে চাঁদা দেওয়া বা অন্য কোনো উপায়ে এর সহায়তা করবেন না এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ পরিপন্থি কোনো কার্যকলাপে নিজেকে জড়াবেন না।’

কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ দর্শাতে খসড়ায় বলা হয়েছে। জবাবে সন্তুষ্ট না হলে কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করবে। কমিটিতে জেলা সদরের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা তাঁর প্রতিনিধি, উপজেলার ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বা তার প্রতিনিধি, অভিভাবক প্রতিনিধি এবং একজন শিক্ষককে রাখতে হবে।

কলেজের বিদায়ী অনুষ্ঠানে তিনি

এ ছাড়া শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা হলে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে। সাময়িক বরখাস্তকালে বেতনের অর্ধেক খোরপোশ পাবেন। এ ছাড়া কোনো অভিযোগ আদালতের রায়ে মিথ্যা প্রমাণিত হলে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিকে বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হবে। 

মহাবিদ্যালয়তালিকা

 

রাজধানীর সুবজবাগ থানার মাধ্যমিক জেলা শিক্ষা অফিসার মো. মোস্তাক বলেন, আমি মূলত মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেখি। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিলে শাস্তির বিধান নেই নীতিমালায়। যদি সরকার শাস্তির বিধান নীতিমালায় নিয়ে আসলে সেটা বাস্তবায়ন করা হবে।