Image description

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। টানা অতিবৃষ্টি ও উত্তাল সাগরের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজ ভিড়তে না পারায় গত চারদিন ধরে ৫২টি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। একইসঙ্গে অতিবৃষ্টিতে কয়েকটি অফডকে পানি ঢুকে কনটেইনারে সংরক্ষিত অনেক পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, চার দিনের এই দুর্যোগে শতকোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বন্দর সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৫৫টি মাদার ভেসেল অবস্থান করলেও মাত্র তিনটিতে সীমিত পরিসরে পণ্য খালাস চলছে। বৃষ্টির বিরতিতে ধীরগতিতে এসব জাহাজ থেকে পণ্য নামানো হচ্ছে। বাকি ৫২টি জাহাজ পণ্য নিয়ে অলস অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

সমুদ্র উত্তাল থাকায় গভীর সাগরে লাইটার জাহাজ যেতে পারছে না। ফলে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে নির্ধারিত সময়ে পণ্য খালাস সম্ভব না হওয়ায় ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি প্রতিটি জাহাজের জন্য আমদানিকারকদের প্রতিদিন ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ওয়েটিং চার্জ গুনতে হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের প্রভাবে সমুদ্র উত্তাল রয়েছে এবং বহির্নোঙর এলাকায় ভারী বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়া বইছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে পণ্য খালাস সীমিত রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে পচনশীল পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে বিঘ্ন ঘটলেও বন্দরের মূল জেটিতে কনটেইনারবাহী জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামা স্বাভাবিক রয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে বহির্নোঙরের জটও দ্রুত কেটে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

বন্দর সূত্র জানায়, প্রধান জেটিতে কার্যক্রম সচল থাকলেও অতিবৃষ্টি ও নগরজুড়ে জলাবদ্ধতার কারণে কনটেইনার ডেলিভারি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে বন্দরের ইয়ার্ড থেকে প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার কনটেইনার ডেলিভারি হলেও গত চারদিন ধরে তা দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ কনটেইনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এতে একদিকে বহির্নোঙরে জাহাজের সারি দীর্ঘ হচ্ছে; অন্যদিকে বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনারের চাপও বাড়ছে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল ইসলাম সুজন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের গভীরতা সাড়ে ৯ মিটার হওয়ায় ১২ মিটারের বেশি ড্রাফটের মাদার ভেসেল সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। এসব জাহাজ বন্দরের নৌ-সীমায় বহির্নোঙর হিসেবে পরিচিতি বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় অবস্থান করে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে। এ ক্ষেত্রে লাইটার জাহাজগুলো মাদার ভ্যাসেলের সঙ্গেই নোঙর করতে হয়। 

তিনি বলেন, সাগর উত্তাল থাকলে পাশাপাশি দুই জাহাজের সংঘর্ষের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে এ অবস্থায় পণ্য খালাস বন্ধ রাখার বিকল্প থাকে না। ফলে জাহাজভেদে প্রতিদিনের নির্ধারিত ওয়েটিং চার্জ গুনতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।

বিজিএমইএর পরিচালক এমডিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, চলমান দুর্যোগে ব্যবসায়ীরা বহুমুখী ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সময়মতো কাঁচামাল খালাস না হওয়ায় শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাজার সরবরাহেও প্রভাব পড়ছে। একইসঙ্গে মাদার ভেসেলের অতিরিক্ত ওয়েটিং চার্জও আমদানিকারকদের বহন করতে হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, অতিবৃষ্টিতে বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন অফডক ও উপকূলীয় সংরক্ষণ এলাকায় কনটেইনারে পানি ঢুকে আমদানি-রপ্তানির পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শ্রমিক কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় কারখানাগুলোতেও উপস্থিতি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে চার দিনের দুর্যোগে শতকোটি টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।