ফেনীর রাজনীতিতে একক প্রভাব বিস্তারকারী পতিত গডফাদার পলাতক নিজাম উদ্দিন হাজারীর বিরুদ্ধে জমি দখল ও নামমাত্র মূল্যে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার অভিযোগ বহু পুরোনো। দীর্ঘদিন ধরে সেই অভিযোগের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে। বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বী কয়েকটি পরিবারের দাবি, একসময় স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের কাছে নিজেদের জমি ও বসতভিটার নিয়ন্ত্রণ হারাতে হয়েছিল তাদের। সময় বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতাও পাল্টেছে, কিন্তু হারানো সম্পত্তি এখনো ফিরে পাননি তারা।
ফেনী শহর ও আশপাশের এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজাম হাজারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তি ও পরিবারের জমি দখল, নামমাত্র মূল্যে জমি লিখে নেওয়া এবং প্রভাব খাটিয়ে সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কয়েকটি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের অভিযোগ বিশেষভাবে আলোচিত।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ায় গড়ে ওঠা একটি বিলাসবহুল বাগানবাড়িকে ঘিরে বছরের পর বছর নানা আলোচনা ছিল। স্থানীয়দের দাবি, ওই বাড়ির জন্য জমি কেনা নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, অনেক জমির মালিক স্বেচ্ছায় জমি বিক্রি করেননি, বরং রাজনৈতিক প্রভাব ও চাপের মুখে জমি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা।
বিলাসবহুল বাগানবাড়ির ভেতরে হেলিপ্যাড, টেনিস কোর্ট, সুইমিংপুল, থিয়েটার, ঝরনা ও সুসজ্জিত বাগান ছিল। প্রচার রয়েছে, বাড়ির মেঝেতে ব্যবহৃত মার্বেল আনা হয়েছিল ইতালি থেকে। আসবাবপত্র আনা হয়েছিল সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও তুরস্ক থেকে। ২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাড়িটিতে আগুন দেওয়া হয়। সেটি দেখতে তখন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ভিড় করেন।
স্থানীয় লোকজনের দাবি, জৌলুসপূর্ণ এই বিশাল বাগানবাড়ির পেছনে রয়েছে বহু মানুষের কান্না। তাদের অভিযোগ, নিজাম হাজারী এখানকার জমি স্থানীয়দের কাছ থেকে অনেকটা জোর করেই নিয়েছেন। কেউ কেউ নামমাত্র মূল্য পেয়েছেন, আবার কেউ কেউ সেটাও পাননি। জমির মালিকদের মধ্যে নিজাম হাজারীর আত্মীয়ও ছিলেন। আবার হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের জমিও সেখানে ছিল। মাস্টারপাড়ার এই বাগানবাড়িতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলের শীর্ষ নেতারা উঠতেন বলেও জানান স্থানীয়রা।
যাদের জমি জোর করে বিক্রি করতে বাধ্য করেন তারা হাজারীর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তখন নীরব ছিলেন। এ কারণে জমি হারানোর কেউ কেউ পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, তারা যথাযথ মূল্য পাননি। হরিমোহন নাথ নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, আমার তিন শতক জায়গা ছিল, যার বাজার মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। সেই জায়গা দখল করে পরে নিজাম হাজারী বিলাসবহুল বাগানবাড়ি করেছে। তৎকালীন পৌর কাউন্সিলর খোকন হাজারীর নেতৃত্বে কয়েকজন লোক আমাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে জায়গাটি রেজিস্ট্রি নিয়েছে। বিনিময়ে এক টাকাও দেননি।
একইভাবে দক্ষিণ সহদেবপুর এলাকার অঞ্জন ঘোষের ছয় শতক ও রিপন দেবনাথের তিন শতক জমি নিয়েও জবর দখলের অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, মন্দিরের রাস্তার কথা বলে আমাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক কোটি টাকার এই জায়গা দখল করে নিয়েছিল। সে সময় কেউই ভয়ে মুখ খুলতে পারেননি। প্রতিবাদ করলে তো আর জীবন রক্ষা পাবে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী বলেন, আমাদের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জায়গা দখল করে রাজপ্রাসাদ গড়ে তোলা হয়েছিল। আমরা আমাদের জায়গা ফিরে পেতে চাই।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুধু এ বিলাসবহুল বাড়িতেই নয়, একই কায়দায় মানুষের জমি দখলে নিয়ে শহরের স্টেশন রোড এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ও নির্মাণ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে ভবনটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে একজন হোমিও চিকিৎসক মিথুন চন্দ্র দে। তার দাবি, শহরের প্রাণকেন্দ্র স্টেশন রোডে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে অর্ধ শতাংশ জমি ৫৭ লাখ টাকায় কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই জমির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কম দেখিয়ে জোর করে মাত্র ১২ লাখ ৪ হাজার টাকায় নিজাম হাজারী দখল করে। সেখানে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় নির্মাণ করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্টেশন রোডে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, হিন্দু পরিবারের সম্পত্তি নিজাম হাজারী নিজের নামে রেজিস্ট্রি করলেও তা গোপন রাখতে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভবন তৈরি করেন। এই ভবন নির্মাণেও নিজ দলীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
ভুক্তভোগী মিথুন চন্দ্র দে বলেন, উনি (নিজাম হাজারী) ছিলেন প্রভাবশালী এমপি। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে কী আমি দুনিয়াতে থাকতে পারব? তারা আমার জায়গাটি জোর করে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছিল। নিজাম হাজারী গরুর খামার করতে গিয়েও জায়গা দখল করে নেয়। যেখানে আমার স্ত্রী ও শ্বশুরের শ্মশান ছিল। এই খারাপ লাগা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। জমিটি হারানোর পর শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয়নি, পারিবারিক ও মানসিকভাবেও বড় আঘাত পেয়েছি।
একই ধরনের অভিযোগ করেন ইলিয়াস মিয়া। তার ভাষ্য, বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে জমি হস্তান্তরে বাধ্য করা হয়েছিল তাকে। তিনি বলেন, ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় জমিটি কিনেছিলাম। কিন্তু ছয় মাসের ব্যবধানে সেই জমি মাত্র ২৬ লাখ টাকায় জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় নির্মাণের জন্য লিখে নেওয়া হয়। পৌর ২ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর ও এমপির চাচাতো ভাই খোকন হাজারী নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেখানে থাকা আমার ঘরটি ভেঙে ফেলে। এটি এমপির অর্ডার বলে দখল করে নেয়।