সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা এবং বিশ্বমঞ্চে অটিজম আন্দোলনের এক পরিচিত মুখ। স্বামী খন্দকার মাশরুর হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘ ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবন শেষ করেছেন বিয়ে-বিচ্ছেদে। তবে খালি হাতে নয়, এই বিচ্ছেদের জন্য পেয়েছেন নগদ আড়াই লাখ ডলার, বর্তমান দরে যা তিন কোটি টাকার কিছু বেশি। নগদে এই ‘অল্প’ টাকা পেলেও স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে পেয়েছেন মার্কিন মুল্লুকের ফ্লোরিডায় দুটি বাড়ি, যেগুলোর বর্তমান বাজারদর প্রায় ১০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সম্পত্তি-সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালতের নথিতে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
শেখ হাসিনার কন্যা পুতুল আর খন্দকার মাশরুর দুজনেই কানাডার পাসপোর্টধারী, সেদেশের নাগরিক। তবে তাদের বিয়ে হয় ঢাকায়, ১৯৯৫ সালে। শেখ হাসিনা তখন জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী।
পুতুলের দাম্পত্য অশান্তি ও বিয়ে-বিচ্ছেদ ছিল বিগত আওয়ামী লীগ আমলে আড়ালে-আবডালে মুখরোচক আলোচনার বিষয়। কখনো তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদের প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়া হয়নি, এমনকি কোনো গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যেমেও তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদের চুক্তি প্রকাশ হয়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে একটি আদালতে ২০২১ সালে করা পুতুল ও খন্দকার মাশরুর হোসেনের বিবাহ-বিচ্ছেদের চুক্তির কপি এখন টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে।
দুবাই আদালতের ফ্যামিলি গাইডেন্স অ্যান্ড রিফর্মেশন বিভাগে করা এই চুক্তি অনুসারে, বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য পুতুলকে নগদ আড়াই লাখ মার্কিন ডলার দেবেন খন্দকার মাশরুর রহমান। এর সঙ্গে দেবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুজনের যৌথ নামে থাকা দুটি বিশাল সম্পত্তি। এ দুটি সম্পত্তির একটি সেন্ট জনস কাউন্টির ফ্লোরিডার ফ্রুট কোভের ৪৫৬ বে পয়েন্ট ওয়ে’তে, অপরটি মেইটল্যান্ডের ৮৪৫ ইয়র্ক ওয়ে’তে অবস্থিত।
চুক্তি অনুযায়ী, এই সম্পত্তি দুটি ফ্লোরিডার ‘নেভা ইনকরপোরেটেড’ নামের একটি লাভজনক সংস্থার কাছে হস্তান্তর করবেন খন্দকার মাশরুর হোসেন। এই নেভা ইনকরপোরেটেডের আইনি মালিক এবং একমাত্র সুবিধাভোগী হচ্ছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল!
এসব সম্পত্তির বাইরে পুতুলের বিয়েতে পাওয়া উপহার, বিয়ের সামগ্রী, ব্যক্তিগত আসবাবপত্র, পোশাক, অলঙ্কারসহ যাবতীয় স্মারকচিহ্নও ফেরত দেবেন খন্দকার মাশরুর হোসেন। আর পুতুল যেখানে বলবেন, সেখানে এসব সামগ্রী পৌঁছে দিতে হবে।
প্রায় ১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকার সমপরিমাণ নগদ অর্থ ও সম্পত্তি পুতুলের কাছে হস্তান্তরের পর খন্দকার মাশরুর হোসেনের কাছে আর কী পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট রয়েছে, তা প্রাপ্ত নথি থেকে জানা যায়নি।
একই সঙ্গে বাংলাদেশে তার নামে কোনো দৃশ্যমান ব্যবসা বা পেশাগত কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়নি। বিদেশেও তিনি কোনো ব্যবসা বা চাকরিতে যুক্ত ছিলেন, এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি। এ কারণে বিদেশে এই সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রাপ্ত নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সরকারি নথি অনুযায়ী, সেন্ট জনস কাউন্টির বাড়িটি ২০০৫ সালের ১ নভেম্বর মাশরুর ও সায়মা যৌথ নামে কেনেন। ক্রয়মূল্য ছিল ২ লাখ ৪৫ হাজার ডলার। এটির বর্তমান বাজারমূল্য ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪০ ডলার। মেইটল্যান্ডের বাড়িটিও তাদের যৌথ মালিকানায় ছিল। চার শয়নকক্ষ ও দুই বাথরুমবিশিষ্ট এই একতলা বাড়িটির বর্তমান বাজারমূল্য ৪ লাখ ৮৪ হাজার থেকে ৫ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে।
পুতুল-মাশরুরের ঘরে মোট চার সন্তান। তাদের মধ্যে চুক্তির সময় খন্দকার মাশরুর অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই সন্তানের অভিভাবক থাকবেন ঠিকই, তবে কাস্টডিয়ান বা জিম্মাদার হবেন পুতুল। তারা যেখানে চায় পড়াশোনা করবে, তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের যাবতীয় খরচ বহন করবেন মাশরুর।
বিচ্ছেদের চুক্তিতে পুতুলের সাবেক স্বামী হয়ে যাওয়া খন্দকার মাশরুর হোসেন হলেন এক সময়ের প্রভাবশালী মন্ত্রী ফরিদপুরের ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে। অবশ্য আগে কখনো প্রভাবশালী দূরের কথা, রাজনীতিই করেননি খন্দকার মোশাররফ, বরং ছেলের বিয়ের সুবাদে হয়েছেন এমপি ও মন্ত্রী।
ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ এক সময় দেশে মাঝারি পর্যায়ের আমলা হয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগ দিয়ে হয়েছিলেন আন্তর্জাতিক আমলা। ছেলেকে বিয়ে করিয়েই শেখ হাসিনার বেয়াই হয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন।
এক বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নও পেয়ে যান। তবে সেবার কিংবা ২০০১ সালের নির্বাচনে তার ভাগ্যের শিকে ছেঁড়েনি। দুবারই পরাজিত হন বিএনপির চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের কাছে।
তবে ২০০৯ সালে তার ভাগ্য খুলে যায়। সেনাসমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের বিপুল জয়ের সঙ্গে খন্দকার মোশাররফও জয়ী হন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভাতেও জায়গা পেয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই বলে কথা!
প্রথমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন খন্দকার মোশাররফ। তবে মন্ত্রিসভায় ছিলেন প্রচণ্ড দাপুটে সদস্য। দ্বিতীয় দফা সরকারের এক পর্যায়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব পান তিনি।
তখনো ঠিকঠাকই চলছিল সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও খন্দকার মাশরুর হোসেনের সংসার। তবে ২০১৯ সাল থেকেই সেই সংসারের ছন্দ কাটতে থাকে।
এদিকে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে এমপি হলেও ২০১৯ সালের আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় আর জায়গা পাননি খন্দকার মোশাররফ হোসেন। অবশ্য তাকে দলের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করে আওয়ামী লীগ।
এদিকে, পুতুল-মাশরুরের দাম্পত্য সম্পর্ক যত অবনতি হতে থাকে, দেশে খন্দকার মোশাররফেরও কপাল ততই পুড়তে থাকে। ২০২০ থেকে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের চরম অবনতি হলে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলী থেকে বাদ পড়েন তিনি। ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগ থেকেও তাকে বাদ দেওয়া হয়। সেই বছর থেকেই শুরু হয় খন্দকার মোশাররফ-বিরোধী অভিযান।
২০২১ সালে পুতুল আর মাশরুরের বিবাহ বিচ্ছেদের পর দুর্নীতি-দখলবাজি-টেন্ডারবাজির অভিযোগে মোশাররফ-ঘনিষ্ঠদের গ্রেপ্তার করতে থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে তার ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আওয়ামী লীগের সকল পদ হারালেও এলজিআরডি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন, সেই পদ থেকেও তাকে বাদ দেওয়া হয়। সে বছরই দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ড চলে যান খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে সরকারি মনোনয়নে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় বড় পদে চাকরি বাগিয়েছিলেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। অফিস করতেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক অফিস ভারতের দিল্লিতে। তবে আওয়ামী লীগ পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আপত্তির মুখে তাকে অনির্দিষ্টকালের ‘ছুটি’ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। শোনা যায় তিনি এখন কানাডার পাসপোর্টে দুবাইতে সন্তানদের কাছে আর দিল্লিতে মায়ের কাছে যাওয়া-আসা করেন।