Image description

রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুর্নবাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) একজন কর্মচারী পদায়নকে কেন্দ্র করে তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেছে। মো. সোলায়মান নামে এই কর্মচারী ছিলেন নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে প্রথমে তাকে পদায়ন করা হয় কম্পিউটার অপারেটর পদে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই পদায়ন করে। কিন্তু পরবর্তীতে একই কর্মচারীকে পঙ্গু হাসপাতালে পদায়নের ব্যাপারে মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা অফিস আদেশ জারি করা হয়। এই অফিস আদেশে তাকে পদায়ন করা হয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে, যদিও শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা ব্যতিত মন্ত্রণালয় থেকে এ ধরনের মাঠ পর্যায়ের কর্মচারী পর্যায়ের কাউকে পদায়নের নিয়ম বা রীতি নেই। নিয়ম অনুযায়ী এ পদায়নগুলো হবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে। তাছাড়া নিয়োগবিধি অনুযায়ী কম্পিউটার অপারেটরকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদায়নের সুযোগও নেই। এটা বৈধ নয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (স্বাস্থ্য সেবা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ) মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর চাপে এই আদেশগুলো হয়েছে। মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ ধরনের পদায়নে রাজি ছিলেন না। এদিকে পঙ্গু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও এই কর্মচারীর যোগদান গ্রহণে রাজি ছিলেন না। সচিবের ফোনের চাপে পড়ে কম্পিউটার অপারেটর মো. সোলায়মানের যোগদান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নিতে বাধ্য হয়েছেন কর্তৃপক্ষ। তবে যোগদানের পরই মো. সোলায়মান পঙ্গু হাসপাতালে নানা রকমের সমস্যা তৈরি করেছেন। অফিসিয়াল নিয়ম-শৃঙ্খলার কোনো বালাই নেই তার ক্ষেত্রে। হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমনকি পরিচালকের মৌখিক আদেশ-নির্দেশেরও তিনি তেমন একটা তোয়াক্কা করছেন না। যেহেতু তিনি স্বাস্থ্য সচিবের লোক।

জানা গেছে, সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার ছয়ানী ইউনিয়নে। ওখানকার একজন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানও এসেছিলেন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং পঙ্গু হাসপাতালে কম্পিউটার অপারেটর মো. সোলায়মানের সঙ্গে। ইউপি চেয়ারম্যান নিজেকে সচিবের আপন ছোট ভাই বলে দাবি করেছেন। প্রত্যেকটি স্থানে তিনি সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীর প্রভাব খাটিয়ে হম্বিতম্বি করেছেন। তার দুর্ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষুব্ধ-অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এটা সবারই জানা কথা, রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুর্নবাসন প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবৈধ আয়ের অনেক সুযোগ রয়েছে। তাই দুর্নীতিবাজ অনেকেই পঙ্গু হাসপাতালে পদায়নের চেষ্টা করে থাকেন। মো. সোলায়মান ছিলেন নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে কম্পিউটার অপারেটর ও অতিরিক্ত দায়িত্বে প্রধান সহকারী পদে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন এই কর্মচারীকে গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুর্নবাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)-এ কম্পিউটার অপারেটর পদে পদায়ন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমীর স্বাক্ষরে এই অফিস আদেশটি জারি হয়।
কিন্তু এই পর্যায়ে এসে বেঁকে বসেন মো. সোলায়মান। সোলায়মানের দাবি হলো, তাকে নিটোর অর্থাৎ পঙ্গু হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদায়ন করতে হবে। যদিও তাঁর পদ হলো কম্পিউটার অপারেটর। সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী আবারও তদবির করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। তবে এই অবৈধ তদবির অনুযায়ী অফিস আদেশ জারি করতে রাজি হননি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরপরে সচিব মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখার কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন মো. সোলায়মানকে পঙ্গু হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদায়নের জন্য। প্রশাসন শাখার কর্মকর্তারা সচিবের এমন অবৈধ তদবির অনুযায়ী অফিস আদেশ জারি করতে রাজি ছিলেন না। কমপক্ষে দুই দিন এ নিয়ে ব্যাপক চাপাচাপি চলছিল। একই সময়ে মো. সোলায়মান এবং ওই ইউপি চেয়ারম্যান মন্ত্রণালয়ে এসে হম্বিতম্বি করেন বলেও জানা যায়। তাতেও শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাজি হচ্ছিলেন না। এক পর্যায়ে সচিব নিজেই হুমকি-ধমকিমূলক আচরণ করেন। ফলে শাখার কর্মকর্তা বাধ্য হন অফিস আদেশে স্বাক্ষর করতে। গত ৬ মে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রশাসন-১ শাখার উপসচিব সুজিৎ দেবনাথ এই অফিস আদেশটিতে স্বাক্ষর করেন। অফিস আদেশটিতে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের কম্পিউটার অপারেটর মো. সোলায়মানকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুর্নবাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)-এ প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নিজ বেতনে) হিসেবে পদায়ন করা হয়।

অফিস আদেশ হাতে পাওয়ার পর মো. সোলায়মান ওই দিনই নিটোর- এ গিয়ে উপস্থিত হন কাজে যোগ দিতে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মো. সোলায়মানকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদায়নের সর্বশেষ এই অফিস আদেশ দেখে অবাক হন। তাদের কাছে এটি অনেকটা অবিশ^াস্য ঠেকছিল। ইতিপূর্বে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অফিস আদেশ জারি করেছে কম্পিউটার অপারেটর পদে পদায়নের। ওই পদায়নটি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এর এক সপ্তা পরে ৬ মে তাকে একই হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নিজ বেতনে) পদে পদায়নের আদেশটি ছিল অস্বাভাবিক। নীতিমালা অনুযায়ী ৫ম গ্রেড পর্যন্ত বদলি-পদায়ন করার কথা মন্ত্রণালয়। ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে পরের পদগুলোর পদায়ন হবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো রকমের নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। সাধারণতঃ দুদক থেকে এই পর্যায়ের কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ থাকলে মন্ত্রণালয় সরাসরি তা বাস্তবায়ন করার নজির আছে। এই পদায়নটি সেরকমেরও কিছু নয়। তাছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়োগবিধি অনুযায়ী কম্পিউটার অপারেটরকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদায়নের সুযোগ নেই। বিশেষ ক্ষেত্রে কম্পিউটার অপারেটরকে সহকারী প্রোগ্রামার বা প্রোগ্রামার পদের দায়িত্ব দেওয়া যায়। কিন্তু আলোচ্য এই পদায়নে নিয়োগবিধি চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এসব কারণে পঙ্গু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মো. সোলায়মানের যোগদানপত্র গ্রহণে রাজি ছিলেন না। সচিবের এলাকার ওই ইউপি চেয়ারম্যান পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করেন ‘সচিবের ছোটভাই’ পরিচয়ে। এরপরে সচিবও ফোন করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট। ফলে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয় যোগদানপত্র গ্রহণে। তবে হাসপাতালে যোগদানের পর থেকে এই কয়েকদিনে সোলায়মানের নানা রকমের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিরক্ত-অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছেন বলে জানা গেছে।
শীর্ষনিউজ