Image description

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা ভূমি অফিসে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এক নজিরবিহীন জালিয়াতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মূল সার্ভেয়ার ছুটিতে থাকার সুবাদে তার ডিজিটাল ‘ইউজার আইডি’ ও ‘পাসওয়ার্ড’ গোপনে হাতিয়ে নিয়ে অফিসের চেইনম্যানকে রাতারাতি ‘কানুনগো’ সাজিয়ে নামে-বেনামে নামজারি (মিউটেশন) সম্পাদন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউর রহমানের বিরুদ্ধে।

দৈনিক কালবেলার অনুসন্ধানে এ চাঞ্চল্যকর ও অভিনব জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রৌমারী উপজেলা ভূমি অফিসের মূল সার্ভেয়ার তানভীর আহমেদ সম্প্রতি ছুটিতে ছিলেন। এই সুযোগে অফিসের দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা ‘কানুনগো’ পদের অপব্যবহার করে এক অভিনব জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। অফিসের চেইনম্যান এনামুল হককে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে কানুনগোর দায়িত্ব দিয়ে পর্দার আড়ালে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে একের পর এক নামজারি ফাইল ছাড় দেওয়া হয়।

জানা যায়, চেইনম্যান এনামুল হকের নাম এবং ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সার্ভেয়ারের মূল আইডিতে প্রবেশ করা হয়। এরপর তাকে সিস্টেমে ‘কানুনগো’ হিসেবে প্রতিস্থাপন করে আব্দুল কুদ্দুছ নামের এক ব্যক্তির নামজারি আবেদন (নম্বর: ৫৭১১৮৯৫) প্রক্রিয়া করা হয়, যার শুনানির তারিখ ছিল গত ২ এপ্রিল। পরে বড় অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ১ একর ৪২ শতাংশ জমির নামজারি সম্পন্ন করা হয়। যার মিউটেশন মামলা নম্বর— ৫১৮৭(IX-I)/২০২৫-২৬।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি এই পোর্টাল জালিয়াতি সিন্ডিকেটের মূলহোতা স্বয়ং এসিল্যান্ড রাফিউর রহমান। আর এই অবৈধ প্রক্রিয়ায় সহযোগী ও সুবিধাভোগী হিসেবে জড়িয়ে থাকার অভিযোগ উঠেছে চেইনম্যান এনামুল হকের বিরুদ্ধে।

ভূমি অফিসের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে কানুনগো পদটি শূন্য থাকার সুবাদে চেইনম্যান এনামুলসহ অফিসের কয়েজন সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে আসছিল। সার্ভেয়ারের অনুপস্থিতিতে তার ডিজিটাল আইডি ব্যবহার করে সরকারি পোর্টালে লগইন করে এই জালিয়াতি সম্পন্ন করা হয়, যা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের পরিপন্থি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ঘুষের বিনিময়ে নামজারি করে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সুবিধাভোগী আব্দুল কুদ্দুছের ছেলে আরিফুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, বাবার পক্ষে নামজারি করতে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে এই নামজারি সম্পন্ন করে নিয়েছি। তবে কাকে কানুনগো বানিয়েছে, তা আমরা জানি না।

রাতারাতি কানুনগো বনে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চেইনম্যান এনামুল হক কালবেলাকে বলেন, যারা তথ্য দিয়েছে তা ভুয়া।

ঘুষ নেওয়া এবং জালিয়াতির প্রমাণপত্র থাকার কথা বলতেই তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘ঘুষ নিয়েছি কি না স্যারের কাছে গিয়ে বলেন এবং এই বলেই মোবাইলের কল কেটে দেন।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সার্ভেয়ার ও ভারপ্রাপ্ত কানুনগো মো. তানভীর আহমেদ কালবেলাকে জানান, আমি ছুটিতে থাকার বিষয়টি সত্য। তবে আমার আইডি জালিয়াতির কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে, সেটির ভালো-মন্দ এসিল্যান্ড স্যারই বলতে পারবেন। কারণ আইডি দেওয়া বা নেওয়ার সম্পূর্ণ এখতিয়ার তারই। কোনো জালিয়াতি হয়েছে কি না, তা আমি নিজে ও অফিসিয়ালভাবে খতিয়ে দেখব।

এসব সুনির্দিষ্ট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউর রহমান চরম উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের পরিবর্তে তিনি প্রতিবেদককে ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর ভয় দেখিয়ে বলেন, আপনাকে যে এই তথ্য দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে শাস্তি হবে। এটা অফিসের ইন্টারনাল (অভ্যন্তরীণ) ব্যাপার এবং এমন কিছু ঘটেনি। যদি ঘটেও থাকে, তবে তা কারও জানার কথা নয়। কারণ অফিসিয়াল তথ্য আমজনতা জানার নিয়ম নেই।

একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে তিনি প্রতিবেদকের ওপর চড়াও হন এবং আক্রমণাত্মক ভাষায় বলেন, ‘আপনার কাছে যদি প্রমাণপত্র থাকে, তবে আপনি চুরি করে অফিসে ঢুকে এসব তথ্য হাতিয়েছেন। আপনি মিথ্যা কথা বলছেন। আমি যদি বলি আপনি মাদক ব্যবসায়ী, চিহ্নিত চাঁদাবাজ এবং চোর?’

পরে প্রমাণপত্রসহ সাক্ষাতে কথা বলার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি তা নাকচ করে বলেন, ‘সরকারি গোপন নথি কাউকে দেখানোর নিয়ম নেই।’

সার্বিক বিষয়ে রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলাউদ্দিন কালবেলাকে বলেন, আপাতত এই জালিয়াতির বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে এসিল্যান্ড এক মাসের প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন। আমি যখন তার অতিরিক্ত দায়িত্বে আসব, তখন নথিপত্র খতিয়ে দেখে প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পারব।