Image description

শিশুদের ঝরে পড়া রোধ ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেওয়া হয়েছে স্কুল ফিডিং প্রকল্প। কিন্তু এই স্কুল ফিডিংয়ে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।

কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই অনেক স্কুলে খাবার পৌঁছছে না। কোথাও পরিমাণে কম খাবার দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও দেওয়া হচ্ছে বাসি কলা-রুটি-ডিম। ফলে স্কুল ফিডিংয়ের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন উপজেলা থেকে স্কুল ফিডিংয়ের তথ্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হচ্ছে। তারা যেসব তথ্য প্রকল্প অফিস এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাচ্ছে, এতে দেখা যাচ্ছে, খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সমতা ট্রেডার্স সবচেয়ে বেশি অনিয়ম করছে। তারা ময়মনসিংহের গৌরিপুরের ১৭৭টি স্কুলে এক মাস খাবার সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। নেত্রকোনা সদর উপজেলা পাঠাচ্ছে ১০ ভাগের এক ভাগ খাবার।

আবার অনেক স্কুলে পাঠাচ্ছে মানহীন খাবার। কিন্তু এ ধরনের অনিয়মের ক্ষেত্রে কার্যাদেশ বাতিলের বিধান থাকলেও নীরব মন্ত্রণালয়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো স্কুলে যদি মানহীন খাবার দেওয়া হয় বা কোথাও যদি খাবার না পৌঁছায়, তাহলে আমরা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেব। কারণ শিশুদের ক্ষেত্রে আমরা কোনো আপস করব না।’

গত ২২ জুন নেত্রকোনা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি জেলা শিক্ষা অফিস হয়ে অধিদপ্তর ও প্রকল্প পরিচালকের অফিসে আসে।

সেখানে ওই উপজেলার অনেক স্কুলে নিয়মিতভাবে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে জানানো হয়। আবার অনেক স্কুলে পরিমাণে কম খাবার সরবরাহের কথা বলা হয়।

চিঠিতে বলা হয়, গত ৭ জুন থেকে ২১ জুন পর্যন্ত ১৩ কার্যদিবসে নেত্রকোনা সদর উপজেলায় বনরুটি সরবরাহের কথা ছিল দুই লাখ ৭৮ হাজার ৩৭৭টি। সেখানে গেছে মাত্র ২৮ হাজার ৯৮৭টি। ডিম দেওয়ার কথা ছিল দুই লাখ ২৭ হাজার ৭৬৩টি, দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার ৫৯টি। কলা দেওয়ার কথা ছিল ৫০ হাজার ৬১৪টি, কিন্তু পৌঁছেছে মাত্র পাঁচ হাজার তিনটি। বিস্কুট দেওয়ার কথা ছিল ৫০ হাজার ৬১৪ প্যাকেট, দেওয়া হয়েছে দুই হাজার ৩২০ প্যাকেট। দুধ দেওয়ার কথা ছিল ৫০ হাজার ৬১৪ প্যাকেট, দেওয়া হয়েছে ৪৩ হাজার ৮০ প্যাকেট।

সূত্র জানায়, নেত্রকোনা জেলায় খাবার সরবরাহের কাজ পেয়েছে সমতা ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহের নির্ধারিত উপজেলায় ৩০০ কোটি টাকার খাবার সরবরাহের কাজ পেয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো স্কুলে খাবার না পৌঁছানো বা কম পৌঁছানোর তথ্য আমাদের কাছে নেই। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান খাবার সরবরাহ না করে বা মানহীন খাবার সরবরাহ করে, তাহলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেব। আমরা প্রথমে তাদের শোকজ করব। এরপর তাদের কার্যাদেশ বাতিল করার সুযোগও আমাদের রয়েছে।’

ময়মনসিংহের গৌরিপুর উপজেলার ১৭৭টি স্কুলে এক মাস ধরে স্কুল ফিডিং বন্ধ রয়েছে। অথচ এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় কিছুই জানে না।

নাম প্রকাশ না করে গৌরিপুরের নওপাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, ‘গত ৭ জুন আমাদের স্কুল খুলেছে। এর পর থেকেই খাবার আসছে না। শুধু আমাদের স্কুল নয়, এই উপজেলার অনেক স্কুলে খাবার আসছে না। আমাদের উপজেলায় খাবার সরবরাহের কাজ পেয়েছে সমতা ট্রেডার্স। আমরা তাদের কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। এ ব্যাপারে এখন শিক্ষার্থীরা জানতে চায়, অভিভাবকরা জানতে চায়, আমরা কোনো উত্তর দিতে পারি না। এতে অনেক শিশু স্কুলে আসার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহ হচ্ছে। আমাদের স্কুলেও উপস্থিতি কমে গেছে।’

স্কুল ফিডিংয়ে পচা খাবার সরবরাহের অভিযোগে মাদারীপুর পৌরসভা এলাকা থেকে দুজন গ্রেপ্তার হয়। তাঁরা হলেন এ এফ এম আহসানুল হাবিব ও মো. নুরুজ্জামান। তাঁরা দুজনেই সমতা ট্রেডার্সের অপারেশনস ম্যানেজার। পচা ডিম, বাসি পাউরুটি খেয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলার বেশ কয়েকজন শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরপর ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাদী হয়ে মামলা করলে ওই দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সমতা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী রেজাউল আলম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বনরুটিসহ অন্যান্য খাবার সরবরাহের জন্য যেসব কারখানার সঙ্গে চুক্তি করেছিলাম, তারা মানসম্পন্ন খাবার দিতে পারছে না। এ জন্য ময়মনসিংহ বেল্টের কিছু জায়গায় ঠিকভাবে খাবার সরবরাহ করতে পারছি না। আমরা এ ব্যাপারে কাজ করছি। খুব শিগগিরই হয়তো সব জায়গায় মানসম্পন্ন খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারব।’

নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘একবারে এত পরিমাণ খাবার সরবরাহের বেকারি বা কারখানা পাওয়াটা কষ্টকর। তবে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। অন্য প্রতিষ্ঠানেরও মানহীন খাবার পাওয়া গেছে। কিন্তু মামলা হয়েছে শুধু আমার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দরপত্রের শর্তে স্পষ্টভাবে বলা আছে, খাবারের ব্যাপারে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে কার্যাদেশ বাতিল করা হবে। কিন্তু সমতা ট্রেডার্স পচা-বাসি খাবার দেওয়ার পাশাপাশি অনেক স্কুলে খাবারই দিচ্ছে না, এর পরও মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। শুধু দু-একটা তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে। অথচ বিধি অনুযায়ী যারা অনিয়ম করবে, তাদের কার্যাদেশ বাতিল করে পরবর্তীতে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের নতুন করে কার্যাদেশ দেওয়ার কথা। কিন্তু এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিচ্ছে না মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর।

জানা যায়, বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা এবং পুষ্টি উন্নয়নে নির্বাচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি’ শীর্ষক প্রকল্পটি গত ১৫ নভেম্বর শুরু হয়। পাঁচ হাজার ৪৫২ কোটি টাকার প্রকল্পটিতে এরই মধ্যে দুই হাজার ১৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রকল্প মেয়াদকালে দেশের নির্বাচিত ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩১ লাখ ১৩ হাজার শিক্ষার্থীকে খাবার দেওয়া হবে।

প্রত্যেক সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসে ফর্টিফায়েড বিস্কুট, কলা বা মৌসুমি ফল, বনরুটি, ডিম এবং ইউএইচটি দুধ তথা পুষ্টিকর খাবার পাবে শিশুরা। রবিবার ১২০ গ্রাম ওজনের বনরুটি এবং সিদ্ধ ডিম, সোমবার বনরুটি এবং ২০০ গ্রাম ইউএইচটি দুধ, মঙ্গলবার ৭৫ গ্রাম ওজনের ফর্টিফায়েড বিস্কুট এবং কলা বা স্থানীয় মৌসুমি ফল, বুধবার এবং বৃহস্পতিবার বনরুটি ও সিদ্ধ ডিম দেওয়ার কথা। কিন্তু এসবের কিছুই মানছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।