Image description
চট্টগ্রাম বন্দর

চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন শেড থেকে চার বছরে অন্তত আড়াইশ কনটেইনার উধাও হয়ে গেছে। কাগজে-কলমে এসব কনটেইনার বন্দরের শেডে থাকার তথ্য থাকলেও বাস্তবে নেই। চট্টগ্রাম কাস্টমসের চিঠির বরাতেই কনটেইনার গায়েবের অভিযোগ সামনে এসেছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলেছে, রাজস্বসংশ্লিষ্ট কনটেইনারগুলোর হদিস চেয়ে দফায় দফায় চিঠি দিলেও বন্দর কর্তৃপক্ষের জবাব মিলছে না। অভিযোগ উঠেছে, বন্দরের কঠোর নিরাপত্তাবলয় ভেঙে নানা কৌশলে এসব কনটেইনার বের করে নিয়েছে একটি চক্র। এক্ষেত্রে বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের দায়দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

২০২১ থেকে ২০২৪ সাল-চার বছরে কনটেইনারগুলো গায়েব হয়েছে বলে কাস্টমস সূত্র দাবি করেছে। এদিকে এর আগেও বিভিন্ন সময় এভাবে কনটেইনার গায়েবের ঘটনা ধরা পড়েছে। তদন্ত কমিটিও হয়েছে। কিন্তু তাতে জড়িত চক্রকে চিহ্নিত করা হয়নি। বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআই থেকে কনটেইনার গায়েবের ঘটনায় আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ শেড বা ইয়ার্ড থেকে কনটেইনার গায়েবের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আমদানি পণ্যভর্তি কোনো কনটেইনার সন্দেহজনক হলেই কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আটকে দেয়। অর্থাৎ এসাইকোডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে সন্দেহজনক কনটেইনারের ডেলিভারি স্ট্যাটাস লক করে দেওয়া হয়। শতভাগ কায়িক পরীক্ষা শেষে সবকিছু ঠিক থাকলে সিস্টেমে ডেলিভারি আনলক করা হয়। আর কোনো কনটেইনার আমদানিকারক ডেলিভারি না নিলে তা বন্দরের বিশেষ জোনে রাখা হয়। বন্দর ও কাস্টমসের সব প্রক্রিয়া শেষে কনটেইনারভর্তি পণ্য নিলামে তোলা হয়। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ ধরনের আড়াইশ কনটেইনার আটকে দিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। অনেক অসাধু আমদানিকারক শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার জন্য মিথ্যা ঘোষণায় বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসে। কাস্টমসকে ম্যানেজ করে অনেক সময় তারা পণ্য বের করে নিয়ে যায়। আর ম্যানেজ করতে না পারলে সেই পণ্য আটকে যায়। শুল্ক দিয়ে কনটেইনার বের করলে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হবে-এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আমদানিকারক সেই কনটেইনার আর ডেলিভারি নেয় না। গত চার বছরে এমন ডেলিভারি না নেওয়া কনটেইনারের সংখ্যা ২৫০ টির মতো বলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দাবি।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের এসাইকোডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লক স্ট্যাটাসে থাকা কনটেইনারের মধ্যে রয়েছে- ২০২১ সালে ৮৩টি, ২০২২ সালের ৬১টি, ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের ৬৬টি। কাগজে-কলমে বা সিস্টেমে এসব কনটেইনার বন্দরে রয়েছে বলে তথ্য থাকলেও বাস্তবে এসব কনটেইনার খুঁজে পাওয়া যায়নি। কনটেইনারগুলো কোথায় রয়েছে, তা খুঁজে দেয়ার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে পাঁচটি চিঠি দিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তারা কনটেইনারগুলো খুঁজে দিতে পারেনি। এতেই ধারণা করা হচ্ছে কনটেইনারগুলো অসাধু চক্র কোনো কৌশলে বের করে নিয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা দুই কনটেইনার কাপড় ডকুমেন্টের ভিত্তিতে নিলামে তোলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। শাহ আমানত ট্রেডিং নামের একটি কোম্পানি নিলামে কনটেইনার দুটি কেনে। টাকা পরিশোধের পর ইয়ার্ডে গিয়ে আর কনটেইনার দুটি খুঁজে পাননি নিলামগ্রহীতা। এতেই শুরু হয় তোলপাড়। এতদিন কাগজে-কলমে থাকা কনটেইনারগুলোর অবস্থান জানার উদ্যোগ নেয় কাস্টম হাউজ। একইভাবে এসাইকুডা সিস্টেমে আনলক থাকা অন্য কনটেইনারগুলোর খোঁজ নিতে গেলে তার হদিস পাওয়া যায়নি। এভাবেই কনটেইনার গায়েবের বিষয়টি সামনে আসে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কাস্টমস কর্তৃপক্ষের চিঠিতে লক করা ২৫০টি পণ্য চালানের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা ২৪৭টি। এতে ১৬৪টি পণ্য চালানের মধ্যে এফসিএল (ফুল কনটেইনার লোড) ২৯৩ বক্স এবং অবশিষ্ট ৮৩টি পণ্য চালানে এলসিএল (লুজ কনটেইনার লোড বা খোলা পণ্য) কার্গো রয়েছে। ২৯৩ বক্স কনটেইনারের মধ্যে কাস্টমস আউট পাশের মাধ্যমে বন্দর থেকে ডেলিভারি হয়েছে ৮৮ বক্স কনটেইনার। আইজিএম বা ইমপোর্ট মেনিফেস্টো ঘোষণা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রাইভেট ডিপোতে স্থানান্তর হয়েছে ৭০ বক্স কনটেইনার। চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে স্থিত রয়েছে ১৩১ বক্স কনটেইনার। এছাড়া কাস্টমসের প্রদত্ত পণ্য চালানে বর্ণিত চারটি কনটেইনার নম্বর সঠিক ডিজিটভুক্ত নয়। অবশিষ্ট ৮৩টি এলসিএল পণ্য চালানের মধ্যে কাস্টমস আউট পাশের মাধ্যমে ডেলিভারি হয়েছে ৮ বক্স পণ্য চালান। চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন শেডে রয়েছে ৩৫টি পণ্য চালান। কাস্টমস প্রদত্ত বিএল (বিল অব লেডিং) নম্বরের সঙ্গে বাকি ৪০টি চালানের সঠিকতা নেই। বিষয়টি পত্রমারফত কাস্টমসকে জানানো হয়েছে বলে জানান বন্দর সচিব।