Image description

ভোলার চরফ্যাশনের চেয়ারম্যান বাজার ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী লিয়া আক্তার। ১ জুলাই সকালে বাড়ি থেকে মাদ্রাসার উদ্দেশে হেঁটে রওনা হয়। আঞ্চলিক সড়কে বালুভর্তি ট্রলি ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যায় লিয়া। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সহপাঠীরা লিয়ার লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে সড়ক অবরোধ করে।

রাজধানীর ব্যস্ত মোড়, আঞ্চলিক সড়ক কিংবা জাতীয় মহাসড়ক অনিরাপদ হয়ে উঠছে পথচারীদের জন্য। প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল কিংবা বাজারে যেতে রাস্তা পার হওয়ার সময় প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে। বিভিন্ন গবেষণা এবং সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বলছে, সড়কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন পথচারীরাই। অথচ সড়ক পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এখনো যানবাহনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মানুষের নিরাপদ হাঁটার বিষয়টি রয়ে গেছে উপেক্ষিত। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে ৫৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ১৯৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতের ৫৭ জন শিশু ও ৬৮ জন নারী। দুর্ঘটনার প্রায় এক-চতুর্থাংশই ছিল পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা।

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি কোঅডিনেটর ড. শরিফুল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সড়কে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে পথচারী। বিশ্বে স্বীকৃত সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের প্রধান ভিত্তি পথচারীকে নিরাপদ করা। মানুষ ভুল করলেও এ ভুল যেন মৃত্যুর কারণ না হয়। সুতরাং সড়কের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা এমন হতে হবে যাতে পথচারী সর্বোচ্চ নিরাপদে চলাচল করতে পারেন। যে সড়কে পথচারী সবচেয়ে বেশি নিরাপদ, সেটি হচ্ছে সবচেয়ে নিরাপদ সড়ক। ওই সড়কগুলো আন্তর্জাতিক মানদন্ডে তিন থেকে পাঁচ তারকায় চিহ্নিত হয়। তবে আন্তজাতিক মানদন্ড বিবেচনায় বাংলাদেশের সড়কগুলোর কোনো ধরনের অডিট হয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক নিরাপদ করতে দরকার আইনি কাঠামো ও বাধ্যবাধকতা। কিন্তু আমাদের কোনো আইন নেই, যেখানে প্রতিটি সড়কের জন্য এ ধরনের অডিট করার কথা বলা আছে। তাই আমাদের দাবি একটি সড়ক নিরাপত্তা আইন। যেখানে নিয়মিতভাবে প্রতিটি সড়কে রোড সেফটি অডিট হবে। 

সে অনুযায়ী সড়কগুলোর অবকাঠামোয় পবিবর্তন আনা এবং পথচারীদের জন্য সর্বাধিক নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।’ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের প্রায় অর্ধেকই পথচারী। রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের প্রায় ৭০ শতাংশ পথচারী। গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের মোট যাতায়াতের প্রায় ৬০ শতাংশ রাস্তা হেঁটে যাওয়া যায়। কিন্তু সেই বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ফুটপাত, নিরাপদ জেব্রা ক্রসিং, ট্রাফিক সিগন্যাল কিংবা নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নেই। অনেক জায়গায় ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে মূল সড়কে হাঁটে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। 

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাজার, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসস্ট্যান্ড ও শিল্পাঞ্চলের সামন দিয়ে যাওয়া মহাসড়কগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এসব স্থানে মানুষকে নিয়মিত রাস্তা পার হতে হয়, কিন্তু অধিকাংশ জায়গায় নেই জেব্রা ক্রসিং, সিগন্যাল কিংবা গতিনিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রাস্তায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে পথচারীদের আগে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এরপর যানবাহনের বিষয়ে ভাবতে হবে। ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস দিয়ে সবার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয় না। পথচারীদের কথা চিন্তা না করে সড়ক তৈরি করলে তাদের জন্য পারাপার কঠিন হয়ে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রিটমেন্ট এবং আইনের বাস্তবায়ন জরুরি।’