Image description
লক্ষ্মীপুরে মা ও তিন মেয়েকে হত্যা

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে তিন মেয়েসহ মাকে কুপিয়ে হত্যার সাত দিন পেরিয়ে গেলেও উদঘাটন হয়নি রহস্য। গণপিটুনিতে সন্দেহভাজন ঘাতক নিহত হওয়ায় জানা যায়নি হত্যার কারণ। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে জনমনে দেখা দিয়েছে নানান প্রশ্ন। ঠিক কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড তা নিয়ে চলছে নানান আলোচনা।

তবে পুলিশ বলছেন দ্রুতই এ মামলার জট খুলবে। প্রকাশ করা হবে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য।

স্থানীয়রা বলছেন, ঘাতক অন্তর মজুমদার মাদকাসক্ত। তার সঙ্গে নিহত ব্যক্তিদের পূর্বপরিচয়, স্বর্ণালংকার লুট, অর্থ লেনদেন ও পূর্ববিরোধÑএখন পর্যন্ত সম্ভাব্য কারণ হিসেবে এগুলোই সামনে এসেছে।

অন্তর প্রায় দেড় বছর ওই ভবনের ৫ তলায় ভাড়া থাকতেন। প্রায় ৮ মাস আগে সে এ বাসা ছেড়ে চলে যায়। অন্তর জানত বাসা ভাড়ার টাকা সবাই শাহিনুরের কাছে জমা দেয় এবং তার কিছু স্বর্ণালংকারও ছিল। এতে ডাকাতির উদ্দেশ্যেই অন্তর ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলে ধারণা করছেন।

স্থানীয় প্রতিবেশী ঝর্না আক্তার মিলি বলেন, এমন ঘটনা আমরা কখনো দেখিনি। তাদের সঙ্গে কারো কোনো ঝগড়া-বিবাদ ছিল না। তার স্বামী নেই, কোনোভাবে পরিবার নিয়ে দীর্ঘদিন এখানে আছেন। তাছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির সহযোগিতায় তারা চলত।

সমাজকর্মী আব্দুর রহমান তুহিন জানান, ২০১৯ সালের রমজান মাসে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শাহিনুর বেগমের স্বামী কামাল হোসেন মারা যায়। তিনি ছিলেন পরহেজগার। তার মৃত্যুতে রায়পুরসহ বিভিন্ন জায়গায় পরিবারটি সহানুভূতি পায়। অনেকেই পরিবারটির পাশে এগিয়ে আসে। তখন শাহিনুরের নামে ৪ লাখ টাকার একটি এফডিআর করা হয়। এছাড়া তার সন্তানরা মেধাবী হওয়ায় অনেকেই তাদের পড়ালেখার দায়িত্ব নেন। অপরদিকে শাহিনুরকে হাসপাতালে একটি চাকরিও দেওয়া হয়। বিভিন্ন দানবীর ব্যক্তি পরিবারটিকে সহায়তা করে। এভাবেই পরিবারটি কোনোভাবে চলত। তাদের সঙ্গে এমন কারও ঝগড়া-বিবাদ নেই যে হত্যার মতো ঘটনা ঘটবে।

হত্যাকাণ্ডের সময় বাসায় না থাকায় বেঁচে যায় একমাত্র ছেলে ১৮ বছর বয়সি জুনাইদ ইসলাম সিফাত। সে রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। দীর্ঘদিন ধরেই সে এখানে কর্মরত। সকালবেলা সিফাত তার বাসার অদূরেই কর্মস্থলে চলে যায়।

সিফাত বলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে যদি কেউ থেকে থাকে তাহলে তাদের যাতে আইনের আওতায় আনে এবং আমি সঠিক বিচার কামনা করি। যাতে প্রশাসন দ্রুতই ব্যবস্থা নেয়।

রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, আমাদের কোনো ধারণা নেই এ ধরনের ঘটনা কেন ঘটল, কি কারণে ঘটল। কোনো ঘটনা ছাড়া এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড মেনে নেওয়া যায় না। এর রহস্য উদঘাটন করা জরুরি।

তিনি আরো বলেন, সিফাত আমার কাছে চাকরি করত। সে আগে যেভাবে আমার কাছে ছিল এখনো সেভাবেই আছে। কেউ যদি তার দায়িত্ব নিতে চায় তাহলে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান করেন।

ময়নাতদন্ত টিমের সদস্য ও সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. অরূপ পাল বলেন, প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। অধিকতর তদন্তের জন্য ময়নাতদন্তে ভ্যাজাইনাল সোয়াহ সংগ্রহ করা হয়েছে। যা পরবর্তী সময়ে পুলিশের কাছে রিপোর্ট প্রদান করা হবে। অন্যদিকে প্রত্যেকের মাথায়, গলায়, হাত ও বুকে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অবস্) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, মাসহ তিন মেয়ে হত্যার ঘটনা উদঘাটনের জন্য আমাদের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। আমরা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। শিগগিরই আমরা এ মামলার রহস্য প্রকাশ করব।

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার সকালে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা নদীর পাড় সড়কের আমির হোসেন মাস্টারের ৫ তলা ভবনের নিচতলার বাসায় ঢুকে শাহিনুর বেগম (৩৮), তার মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ও ছোট মেয়ে ফাতেমা আক্তার শিফাকে (১০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের চিৎকার শুনে জানালা দিয়ে বাসায় এক লোককে দেখতে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আফরোজা বেগম রানী বাইরে থেকে গেট বন্ধ করে দেয়। এতে অভিযুক্ত ঘাতক অন্তর মজুমদার ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে। পরে ওই নারী আশপাশের লোকজনকে খবর দিলে তারা বাসায় ঢুকে নিহতদের রক্তাক্ত দেহ মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে। অভিযুক্ত ঘাতক বাসার ছাদে উঠে পার্শ্ববর্তী বাসার ছাদে গিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। পরে স্থানীয় জনগণ জড়ো হয়ে তাকে গণপিটুনি দেয়। পরে সে মারা যায়।