Image description

সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি ৪৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ রপ্তানি কমেছে দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থবছরের ১২ মাসের মধ্যে মাত্র দুই মাস রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও বাকি ১০ মাসই নেতিবাচক ধারা থাকায় বছর শেষে সামগ্রিক রপ্তানি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে পারেনি। বিশেষ করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়াই সামগ্রিক চিত্রকে প্রভাবিত করেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ি অর্থবছরে মোট ৪৮ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলার।

রপ্তানির মাসভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়, অর্থবছরের শুরুটা ছিল আশাব্যঞ্জক। জুলাই মাসে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী মাস থেকেই রপ্তানিতে ধারাবাহিক পতন শুরু হয়। টানা আট মাস রপ্তানি কমার পর চলতি বছরের এপ্রিলে প্রায় ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও মে ও জুনে আবার রপ্তানি হ্রাস পায়। পুরো অর্থবছরে মাত্র চার মাস রপ্তানি ৪ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে, আর বাকি মাসগুলোতে রপ্তানি ৩ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি ছিল।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক থেকে বিদায়ি অর্থবছরে আয় হয়েছে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় এ খাতের রপ্তানি কমেছে ১.৬৪ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলার। তবে বছরের শেষ মাস জুনে এ খাতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ঐ মাসে ২৭৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় সাড়ে ২১ শতাংশ বেশি।

তৈরি পোশাকের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানিও কমেছে। তবে কয়েকটি খাত ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশল পণ্য এবং হিমায়িত খাদ্যপণ্যের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বিদায়ি অর্থবছরে ৭ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১২.২৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১১.৪৫ বিলিয়ন ডলার। শুধু জুন মাসেই এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৮ কোটি ৭২ লাখ ডলার।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটি উত্স হলো প্রবাসী আয় ও পণ্য রপ্তানি। বিদায়ি অর্থবছরে প্রবাসী আয় এসেছে ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আমদানি ব্যয় কম থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কিছুটা বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপিএম-৬ পদ্ধতির হিসাবে জুন শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১.৫৩ বিলিয়ন ডলার। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পণ্য রপ্তানিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলে রিজার্ভের অবস্থান আরো শক্তিশালী হতে পারত।

রপ্তানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিকূল পরিস্থিতিই তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাদের ভাষ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর পালটা শুল্ক আরোপ করায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি চাপের মুখে পড়ে। একই সময়ে ইউরোপীয় বাজারেও তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। এসব কারণে পোশাক রপ্তানি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। রপ্তানিকারকরা আরো জানান, রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রভাব ইতিমধ্যে শিল্প খাতে পড়তে শুরু করেছে। অনেক কারখানায় উত্পাদন কমানো হয়েছে, 

কোথাও কোথাও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। কিছু কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, উত্পাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী অর্থবছরেও রপ্তানি খাত চ্যালেঞ্জের মুখে থাকতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু অর্থবছর শেষে প্রকৃত রপ্তানি হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ডলার, ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার কম রপ্তানি হয়েছে। অর্থাত্ সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যের প্রায় ৯৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘জুন মাসে নিটওয়্যার ও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যথাক্রমে ১৯.৪৯ শতাংশ এবং ২১.৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি মূলত ঈদুল আজহার কারণে কর্মদিবস বেশি থাকার প্রভাব। গত বছরের জুনের তুলনায় এ বছর কারখানাগুলোতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি কর্মদিবস ছিল। ফলে এই প্রবৃদ্ধিকে নতুন বা বাড়তি রপ্তানি আদেশের প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, ‘জুন মাসে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিটওয়্যার রপ্তানি ২.৫৩ শতাংশ কমেছে। এর প্রধান কারণ বৈশ্বিক বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে উত্পাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য না পাওয়া। একই সময়ে শ্রমিকদের মজুরি প্রায় ৯ শতাংশ, সুতা ১০ শতাংশ, ডাইস ও কেমিক্যালের দাম ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ, পাশাপাশি জ্বালানি ও অন্যান্য উত্পাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে অনেক কারখানা লোকসানের মুখে পড়েছে, কিছু কারখানা উত্পাদন বন্ধ করতেও বাধ্য হয়েছে। এসব কারণ দেশের সামগ্রিক রপ্তানি কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’