ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডর (বিসিএমসি) গড়ে উঠলে তিন দেশের জনগণই উপকৃত হবে। আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে তিন দেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। ভবিষ্যতে অন্য দেশ এ উদ্যোগে যুক্ত হতে চাইলে চীন তাতেও উন্মুক্ত থাকবে। এদিকে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের অনুরোধেই চীন এ প্রকল্পে সহযোগিতা করছে এবং যতটুকু সম্ভব সহায়তা দিয়ে যাবে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রদূত।
গত ৫ দশকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর পারস্পরিক আস্থা গভীর করেছে এবং সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, দুই দেশের যোগাযোগ বৃদ্ধি ও ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার নতুন সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করবে।
তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ প্রকল্পে চীনের প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত আছে। নিজেদের সক্ষমতার মধ্যে থেকে চীন এ প্রকল্পে সহায়তা অব্যাহত রাখবে এবং দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্যতা সমীক্ষাসহ সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত এগিয়ে নেবেন। এই সফরে দুই দেশ একে অপরের মৌলিক জাতীয় স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়ে পারস্পরিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়ে একাধিক প্রশ্নের জবাব দেন চীনের রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, এ প্রকল্প সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের প্রকল্প। উত্তরাঞ্চলের এক কোটির বেশি মানুষের জীবিকা এ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের অনুরোধেই চীন সহযোগিতা করছে এবং যতটুকু সম্ভব সহায়তা দিয়ে যাবে। তিনি বলেন, প্রকল্পটি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি শক্তিশালী ও বৈজ্ঞানিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা। চীন তাদের শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের ঢাকায় পাঠাবে এবং বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এমন একটি সমীক্ষা করা হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্য হবে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিস্তা প্রকল্পে ভারতের আপত্তির প্রসঙ্গে ইয়াও ওয়েন বলেন, চীনের কাছে এটি সম্পূর্ণ একটি জীবিকাভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প। অন্য কোনো বিষয় চীনের বিবেচনায় নেই। বাংলাদেশ যতদিন চাইবে, ততদিন চীন এ প্রকল্পে সহযোগিতা করবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের সফল আয়োজনের জন্য বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রশংসা করেছে বেইজিং। তিনি জানান, বাংলাদেশ আবারও ‘এক চীন’ নীতির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশ স্বীকার করেছে যে, বিশ্বে একটিই চীন রয়েছে এবং তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বলেন, সফরে উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া, দুই দেশের উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয়, সবুজ ও স্বল্প-কার্বন উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো নতুন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে দুই দেশ একমত হয়েছে।
ইয়াও ওয়েন জানান, এই সফরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) প্রথম চীনে তাদের অফিস স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে দুই দেশের উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ আরও সহজ হবে। তিনি জানান, বাংলাদেশের তাজা কাঁঠাল চীনে রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রটোকল সই হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশি আম চীনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল। এখন কাঁঠালও রপ্তানি করা যাবে। ভবিষ্যতে কৃষিপণ্য চীনের বাজারে প্রবেশ করবে। রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে দুই দেশ একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনায় সই করেছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। পাওয়ার চায়নার আগের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, সেটি একটি কোম্পানির উদ্যোগ ছিল। এখন যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেটি দুই সরকারি (জিটুজি) পর্যায়ের সহযোগিতা। তাই নতুন করে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সমীক্ষা করা হবে।
বিসিএমসি নিয়ে তিনি বলেন, এটি নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। প্রায় ১৫ বছর আগে এ ধারণা সামনে আনা হয়েছিল। বিভিন্ন কারণে অগ্রগতি হয়নি। তবে এখন বাংলাদেশ ও চীন উভয়েই আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে আগ্রহী। মিয়ানমারও এ ধরনের সহযোগিতা চায় বলে চীন বিশ্বাস করে। তাই তিন দেশ মিলে করিডর বাস্তবায়নের আলোচনা এগিয়ে নিতে চায়। ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশ যুক্ত হতে চাইলে তাতেও চীন উন্মুক্ত থাকবে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, যৌথ ঘোষণায় উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ এবং পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কোনো সামরিক জোট নয়; বরং কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা খাতের মধ্যে সমন্বয়, কৌশলগত যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতা আরও জোরদার করার একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম। এ ধরনের ব্যবস্থা ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে চীনের রয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
জে-১০ সি যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক যেহেতু নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, তাই প্রতিরক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতা আরও বাড়বে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়ে ইয়াও ওয়েন বলেন, চীনের এআই প্রযুক্তি নিয়ে যে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়, তা ভিত্তিহীন। এআই চীনের মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশও এ প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারে। চীন সহযোগিতায় প্রস্তুত। হুয়াওয়ে ও জেডটিইর মতো চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এ উদ্যোগে যোগ দেওয়ায় দুই দেশের উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ১৯০টির বেশি দেশ ও বিশ্ব সংস্থা ইতোমধ্যেই জিডিআইতে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ ও গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ নিয়েও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খোঁজা হবে।
বাংলাদেশের ব্রিকসে অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) অংশীদার হওয়ার আবেদনেও চীনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে জানান ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ আরও বড় ভূমিকা রাখুক, সেটি চীন চায়। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ ও সামরিকবাদের পুনরুত্থানের যে কোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে কাজ করবে। আগামী ৫০ বছরের ‘স্বর্ণালি অধ্যায়ে’ দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের অর্জিত ঐকমত্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে আরও জোরালো গতি আসবে এবং এর সুফল দুই দেশের জনগণ ভোগ করবে।