Image description

রাজনীতিতে বড় কোনো আন্দোলন ঘটলে সবচেয়ে বড় লড়াইটা হয় আন্দোলনের “গল্প” বা ন্যারেটিভ নিয়ে। কে এই আন্দোলনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে, সেটাই পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার ভাগাভাগি ঠিক করে। জুলাই অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল মূলত ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে, যা পরে সারা দেশের মানুষের অংশগ্রহণে গণআন্দোলনে পরিণত হয় এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

যদি একে “ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান” বা “জেনারেশন জেড-এর বিপ্লব” বলা হয়, তাহলে নতুননেতৃত্ব, নতুন সংগঠন বা এমনকি নতুন রাজনৈতিক জোট তৈরি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিএনপি চায় না যে তাদের দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের বিরোধিতার ইতিহাসকে একপাশে সরিয়ে নতুন কোনো “বিপ্লবী” পরিচয় অন্যরা নিয়ে নিক। তাই নিলুফার চৌধুরী মনি সহ অনেক নেতা বলেন, “এটা হঠাৎ আসেনি, এটা আমাদের পুরনো লড়াইয়েরই অংশ।” এটা আসলে ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ, যেখানে বিএনপির নেতাদের লক্ষ্য হচ্ছে ইতিহাসে বিএনপিকেই “মূল শক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

সব অভ্যুত্থানের পর যে বড় শূন্যতা তৈরি হয়, সেই শূন্যতা পূরণে যে দল নিজেকে এই আন্দোলনের “অংশীদার” বা “মূল চালিকাশক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, সে ভবিষ্যতে নির্বাচনী রাজনীতিতে, জনসমর্থনে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে এগিয়ে থাকবে। বিএনপি চায় জুলাই অভ্যুত্থানকে তাদের “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই”-এর অংশ হিসেবে দেখা হোক, যাতে “জুলাই সনদ” বা অন্যান্য সংস্কারের চাপ কমানো যায় বা নিজেদের মতো করে নেওয়া যায়।এর আরেকটা দিক হচ্ছে বিএনপির দলের ভেতরের রাজনীতি। সিনিয়র নেতারা, যেমন নিলুফার চৌধুরী মনি, দলের ঐতিহ্য, সাংগঠনিক কাঠামো ও নিজেদের অবস্থান রক্ষা করতে চান। অন্যদিকে ছাত্রদল আর যুবদল, যারা মাঠের বাস্তবতা বেশি জানে, তারা দেখেছে কীভাবে জুলাইয়ে আসলে ছাত্ররাই প্রথমে রাস্তায় নেমেছিল। তাই যখন সিনিয়র নেতা “পরিকল্পিত” বলেন, তখন ছাত্রদল প্রতিবাদ করে। এটা একই দলের ভেতরে জেনারেশনাল কনফ্লিক্ট।

রাজনৈতিক দলগুলোর ন্যারেটিভ প্রচারের পাশাপাশি আমাদের বুঝতে হবে সামাজিক আন্দোলনের ফ্রেমিং তত্ত্ব। ফ্রেমিং মানে হলো কোনো ঘটনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, কাকে দায়ী করা হয়, কী সমাধান দেখানো হয় এবং মানুষকে কীভাবে কাজে উদ্বুদ্ধ করা হয়। অ্যাক্টিভিস্টরা এই “ফ্রেম” তৈরি করে যাতে মানুষ সহজে বুঝতে পারে এবং যোগ দেয়।

বিএনপি বছরের পর বছর ধরে একটা শক্তিশালী মাস্টার ফ্রেম তৈরি করেছিল—আওয়ামী লীগের শাসন মানে স্বৈরাচার, ভোট ডাকাতি আর দমন-পীড়ন। তারা বলত, এর থেকে পরিত্রাণের সমাধান হলো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর সুষ্ঠু নির্বাচন। জুলাই অভ্যুত্থানে তারা এই পুরনো ফ্রেমকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। বলেছে, এটা হঠাৎ আসেনি, এটা তাদের দীর্ঘ সংগ্রামেরই ধারাবাহিকতা। কেউ কেউ আবার বলেছে “পরিকল্পিত”, যাতে এটাকে পুরোপুরি ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন বলে না মনে হয়। এটা মূলত ফ্রেম অ্যালাইনমেন্টের চেষ্টা—নতুন সফল ঘটনাকে নিজেদের পুরনো গল্পের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা।

কিন্তু ছাত্র আন্দোলন একদম অন্যভাবে ফ্রেম তৈরি করেছিল। তারা শুরু করেছিল কোটা সংস্কারের নির্দিষ্ট দাবি দিয়ে। তারপর দ্রুত এই দাবিকে হাসিনা পতনের দাবিতে নিয়ে যায়। হাসিনার “রাজাকারের নাতি-নাতনি” মন্তব্যের পর তারা এটাকে উল্টে বলেছিল—এটা শুধু চাকরির দাবি নয়, এটা জাতীয় সম্মান আর যুবকদের ভবিষ্যতের লড়াই। তারা মোটিভেশনাল ফ্রেম তৈরি করে ফেলেছিল—“দেশের ভবিষ্যতের জন্য আমরা জান আর রক্ত দিব”। এই ফ্রেম অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে গিয়েছিল, কারণ এটা ছিল আবেগপূর্ণ, নৈতিক আর প্রজন্মগত।

ডিজিটাল অ্যাক্টিভিজম আন্দোলনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ছাত্ররা ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম আর টেলিগ্রাম ব্যবহার করে দ্রুত ফ্রেম ছড়িয়েছিল। লাইভ স্ট্রিমিং, ছোট ভিডিও, মিম আর ব্যক্তিগত গল্প দিয়ে তারা মানুষের আবেগকে নাড়া দিয়েছিল। হাসিনা সরকার যখন ইন্টারনেট বন্ধ করেছিল, তখনও তারা ভিপিএন দিয়ে চালিয়ে গেছে। এই ডিজিটাল কৌশল তাদের ফ্রেমকে খুব দ্রুত আর বিস্তৃত করে তুলেছিল।
অন্যদিকে বিএনপির ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজি ছিল তাদের গতানুগতিক ঐতিহ্যবাহী। জুলাইয়ের সময় তারা সমর্থন জানিয়েছিল, নিজেদের কর্মীদের শহীদ হওয়ার কথা তুলে ধরেছিল। কিন্তু তাদের কনটেন্ট ছিল বেশি আনুষ্ঠানিক আর রাজনৈতিক। ছাত্রদের মতো আবেগঘন আর দ্রুত ভাইরাল হওয়ার মতো ছিল না, বরং পোস্ট-আপরাইজিং সময় তারা নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে।

বিএনপি ফ্রেমিং তত্ত্ব প্রয়োগ করেছে দীর্ঘমেয়াদি আর স্থিতিশীলভাবে। তারা মাস্টার ফ্রেম রক্ষা করেছে আর নতুন ঘটনাকে সেটার সঙ্গে যুক্ত করেছে। কিন্তু ছাত্ররা দ্রুত, আবেগপূর্ণ এবং যুবকদের মনে গেঁথে যাওয়ার মতো নতুন ফ্রেম তৈরি করেছিল। বিএনপির ডিজিটাল ফ্রেমিং ছিল সংগঠিত আর ধারাবাহিক, কিন্তু কম প্রাণবন্ত। যেখানে ছাত্রদেরটা ছিল ডিসেন্ট্রালাইজড, সত্যিকারের আর ভাইরাল।

ছাত্রদের ডিজিটাল ফ্রেমিং ট্যাকটিক্সের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল “রাজাকার” মন্তব্যের হ্যান্ডলিং। হাসিনার সেই মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর তারা মিনিটের মধ্যে উল্টে দিয়েছে। ভিডিও ক্লিপ, মিম আর পোস্ট দিয়ে বলেছিল, “তুমি কে আমি কে, রাজাকার, রাজাকার।” এর দ্বারা তারা হাসিনা আমলের গতানুগতিক শেমিংকে কাউন্টার করে; বুঝিয়ে দেয় যে হাসিনা সরকার যুবকদের আর স্বাধীনতার ইতিহাসকে বরং অসম্মান করছে। এই কাউন্টার-ফ্রেমিং খুব দ্রুত আন্দোলনকে বড় করে দিয়েছিলো।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শহীদদের ন্যারেটিভ বিল্ডিং। ছাত্ররা নিহতদের নাম, ছবি আর গল্প ছড়িয়েছে। বলেছে, তারা ভবিষ্যতের জন্য প্রাণ দিয়েছে। এটা আন্দোলনকে নৈতিক উচ্চতা দিয়েছে আর মানুষকে আরও দৃঢ় করেছে। প্রতিটি মৃত্যুকে তারা সরকারের নিষ্ঠুরতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

রাজনীতিতে ফ্রেম তৈরি করার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে দল বা গোষ্ঠী মানুষের আবেগ আর বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে ফ্রেম তৈরি করতে পারে, সে জনগণের বুকে জায়গা করে নিতে পারে। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্ররা সেই ক্ষমতা দেখিয়েছিল, বিএনপি কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো নয়। ভবিষ্যতেও যে দল দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা আর দ্রুত আবেগপূর্ণ ফ্রেম তৈরির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারবে, সেই দল বেশি শক্তিশালী হবে।

মনে রাখা জরুরি যে এই ডিজিটাল যুগে ইতিহাস শেষ পর্যন্ত জনগণের স্মৃতি, ভিডিও, নথি ও গবেষণা দিয়ে লেখা হচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থান ছিল ছাত্রদের সাহসী পদক্ষেপ থেকে শুরু হয়ে সারা দেশের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে পরিণত হয়েছিল—যা অস্বীকার করা কঠিন। বিএনপি সহ সকল পুরাতন রাজনৈতিক দল যদি এই অভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনাকে সম্মান করে গণতান্ত্রিক সংস্কার ও জবাবদিহিতার পথে এগোয়, তাহলে হয়তো তারা আরও বেশি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য হবে। আর যদি শুধু “আমরাই করেছি” বা “পরিকল্পিত” বলে ন্যারেটিভ চাপিয়ে দিতে চায়, তা হবে জনগণের স্মৃতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, যা জনগণের সাথে তাদের দূরত্ব বাড়াবে।

রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জনগণেরই। যারা জুলাইয়ে রাস্তায় নেমেছিল, রক্ত দিয়েছিল, আর যারা এখনো স্বপ্ন দেখে একটা ন্যায়সংগত বাংলাদেশের—তারাই তৈরি করবে আগামীর বাংলাদেশ।