Image description

ঢাকার পল্লবীতে পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী সোহেল রানার হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছিল আট বছর বয়সী রামিসা। মৃত্যুর আগে শিশুটিকে ধর্ষণও করা হয়। এরপর লাশ টুকরো করে হয়েছিল গুমের চেষ্টাও।

শুধু রামিসা নয়, কাছাকাছি সময়ে আরও বেশ কয়েকটি শিশু হত্যার ঘটনা উঠে আসে গণমাধ্যমে। যাদের বেশিরভাগই পারিবারিক পরিসরে হত্যার শিকার। এ শিশুদের বড় অংশই প্রতিবেশীর হাতে খুন হয়েছে। খুনের আগে করা হয়েছে নানা ধরনের নির্যাতন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুদের অপহরণ বা ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়। অনেক সময় প্রতিবেশীকে স্রেফ শায়েস্তা করতে বা ফাঁসাতেও ঘটেছে শিশু হত্যা।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো থেকে বছরওয়ারি শিশু হত্যার হিসাব রাখে। তাদের হিসাব বলছে, গত সাড়ে চার বছরে দুই হাজারের বেশি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩৫০ শিশু পারিবারিক গণ্ডিতেই হত্যার শিকার হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই পারিবারিক পরিসরে ৩২ শিশু হত্যার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে।

 

 

একসময় বাংলাদেশে শিশুদের দেখেশুনে রাখতেন প্রতিবেশীরা। আশপাশের কয়েকটি বাড়ির শিশুরা বেড়ে উঠত ভাইবোনের মতো। খেলা, স্কুলে যাওয়া দেখা সব চলত একসঙ্গে। যাদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল, আশপাশের সব বাসার শিশুরা বিশেষ অনুষ্ঠান দেখতে জড়ো হতো তাদের বাড়িতে। এমন অনেক কর্মজীবী মা ছিলেন, যারা প্রতিবেশীর ভরসায় সন্তানকে রেখে অফিসে যেতেন। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই প্রতিবেশীরাই হয়ে উঠছেন অনিরাপদ, কখনো কখনো ভয়ংকর।

ষাটোর্ধ্ব ইয়াসমীন বেগম বলছিলেন, ‘দূরে কোথাও গেলে প্রতিবেশীদের ঘরে খাবার রেখে যেতাম। যাতে বাচ্চারা স্কুল থেকে এসে খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম নিতে পারে। এখন এসব কল্পনাই করা যায় না। বরং ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিবেশীরা।’

প্রায় একই কথা সত্তরোর্ধ্ব ইসমাইল আকনেরও। তিনি জানালেন, তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই স্কুলশিক্ষক ছিলেন। প্রতিবেশীরাই তার দুই ছেলেমেয়েকে বড় করেছেন। কখনো সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়নি। অথচ এখন তার পাঁচ বছরের নাতিকে একা প্রতিবেশীর বাসায় যেতে দেন না। তিনি বললেন, ‘সমাজে মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস, আস্থা দিন দিন উঠে যাচ্ছে। এখন কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না।’

আসকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, পারিবারিক পরিসরে হত্যার শিকার শিশুদের বেশিরভাগের বয়সই ১২ বছরের কম। যাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শিশু ছয় বছর হওয়ার আগেই প্রতিবেশীদের হাতে খুন হয়েছে, এ হার ৬১ শতাংশ।

চট্টগ্রামের পটিয়ায় পাঁচ বছর বয়সী জায়হানকে হত্যা করে প্রতিবেশী পরিবারের সদস্যরা মরদেহ বস্তাবন্দি করে ময়লার স্তূপে ফেলে দিয়েছিল। মৃত্যুর আগে ছেলের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল, অভিযোগ জায়হানের মায়ের। আরেক প্রতিবেশীকে ফাঁসাতেই প্রতিবেশী মো. সাইফুদ্দিন ও তার পরিবারের সদস্যরা মিলে গত ১৬ জুন হত্যা করে শিশুটিকে।

প্রতিবেশীদের এই বদলে যাওয়া আচরণ নিয়ে কথা হয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকারের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, প্রতিবেশীদের মাধ্যমে নৃশংসতার ঘটনা অতীতেও ছিল। তবে তার বেশিরভাগই ছিল জমিসংক্রান্ত। এখন অপরাধের ধরন বদলেছে, সংখ্যায় বাড়ছে। পাশাপাশি নৃশংসতাও বাড়ছে।

 

 

প্রযুক্তির আগ্রাসন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক আচরণকে এর পেছনে মোটা দাগে দায়ী করছেন এ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি বললেন, ‘মানুষের মধ্যে অনেক নেতিবাচক বিষয় প্রচ্ছন্নভাবে থাকে। প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে মানুষ নানানভাবে সহিংসতা দেখছে এবং অবচেতনভাবে সেটা তার মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করছে। যা উসকে দিচ্ছে তার সহিংস মনোভাব। সেখান থেকেই ঘটছে এসব অপরাধ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বললেন আরেকটি প্রসঙ্গ। তার মতে, সমাজে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বেড়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারে মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ কম হচ্ছে। প্রতিবেশীর সঙ্গে আবেগীয় বন্ধন হচ্ছে না। ফলে তাদের পক্ষে নৃশংস হওয়া তুলনামূলক সহজ হয়ে গেছে।

হত্যায় যুক্ত হচ্ছেন নারীরাও: পল্লবীর শিশু রামিসাকে হত্যার পর মরদেহ কেটে গুম করতে স্বামীকে সহযোগিতা করেন স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। আবার চট্টগ্রামের জায়হানকে হত্যা করতে মো. সাইফুদ্দিনকে সহায়তা করে তার স্ত্রী ও মেয়ে।

প্রতিবেশী শিশুকে খুন এবং মরদেহ গুমের ঘটনায় পরিবারের নারী সদস্যদের জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে মেখলা সরকার বলছেন, একসময় নারীদের সময়টা ঘরেই পার হতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে নারীরাও এখন সহিংস ঘটনা বেশি দেখছেন, যুক্তও বেশি হচ্ছেন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নারীরা দোষী পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করতেই খুনের ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন।

নারীদের হত্যায় যুক্ত হওয়াকে সামাজিকভাবে নৈতিক উন্নয়নের ঘাটতি বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি বললেন, ‘একটা সময় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র একই নৈতিকতার মানদণ্ডে বিশ্বাস রাখত। সে জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেছে। অপরাধ করা অনেকের কাছে সাধারণ ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। নারীরাও এর বাইরে নয়।’

মামলা কম হচ্ছে, আলোচিত হলে রায়: আসকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হত্যার ঘটনার তুলনায় মামলার সংখ্যা খুবই কম, মাত্র ৮ শতাংশ। ৯২ শতাংশ শিশু হত্যার ঘটনায় মামলা করা হয়নি। চলতি বছরে মামলার হার আরও কমেছে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পারিবারিক পরিসরে ৩২ শিশু খুন হলেও মাত্র ছয়টি ঘটনায় মামলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্রাইম অ্যান্ড জাস্টিস স্টাডিজের সেক্রেটারি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. তাজুল ইসলাম বললেন, ‘পারিবারিক পরিসরে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে থাকেন পরিচিত ব্যক্তি বা স্বজনরা। এ কারণে এসব ঘটনায় মামলা কম হয়। মামলার খরচের পাশপাশি বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রতাও একটা বড় কারণ।’ আবার ময়নাতদন্ত এড়াতেও অনেক সময় মামলা কম হয়, জানালেন এ আইনজীবী।

রেজাউল করিম সোহাগ বলছিলেন, ‘সমাজ অনেক দূর পর্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। এটা ঠেকাতে অন্তত ৮০ শতাংশ ঘটনায় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে ১০ শতাংশও হচ্ছে না।’ তার মতে, অপরাধ ঠেকাতে অপরাধীদের শাস্তি কার্যকর করার বিকল্প নেই।

অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে কোনো শিশু হত্যার ঘটনা আলোচিত হলে দ্রুত মামলার রায় হয়। যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ‘রামিসা হত্যা মামলা’। ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করেন বিচারিক আদালত। আবার গত ১৭ জুন শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে হত্যার ঘটনায় প্রতিবেশী আবির আলীর ফাঁসির রায় হয়। অবশ্য এসব মামলায় রায় কার্যকরের তেমন নজির নেই।