তৃণমূল কংগ্রেস দখলের যুদ্ধ এবার গড়ালো নির্বাচন কমিশনে। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে দেয়া চিঠি এবং দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো ই-মেইলে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে দলের নাম, নির্বাচনী প্রতীক (জোড়াফুল) এবং তহবিল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা চেয়েছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী। সেইমতো বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় দিল্লির নির্বাচন সদনে কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করে নতুন তৃণমূলের কর্মসমিতির ৩০ জন সদস্য-সহ পদাধিকারীদের নাম এবং বৈঠকের কার্যবিবরণী সহ সমস্ত নথি তুলে দিয়েছেন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ১০ নেতা। প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন বিধায়ক, একজন প্রাক্তন মন্ত্রী।
দলের প্রতীক এবং তহবিল কোন শিবিরের হাতে যাবে, এই প্রশ্নের উত্তরে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “প্রতীক দাবি করবো কেন? আমরাই তৃণমূল কংগ্রেস। কোনো রকম বিতর্কের কোনো প্রশ্নই নেই। দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক আমাদের সঙ্গে। সাবেক মন্ত্রীরা আমাদের সঙ্গে। কাউন্সিলররা আমাদের সঙ্গে, জেলা পরিষদের সদস্যরাও আমাদের সঙ্গে।” আমরা প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি কমিশনের কাছে জমা দিয়েছি। আশা রাখি, কমিশনের তরফ থেকে দ্রুত ডাক পাবো।” যদিও এ বিষয়ে আগে ঋতব্রত বলেছিলেন, ‘‘আমরা যা করেছি আইন মেনে, নিশ্ছিদ্র ভাবে করেছি।’’
তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক জোড়াফুল দখলের আইনি প্রক্রিয়ায় ঋতব্রতেরা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছেন। ঠিক যেভাবে বিজেপি’র সমর্থনে ২০২২ সালে মহারাষ্ট্রে একনাথ শিন্ডে ও ২০২৩ সালে অজিত পাওয়ার শিবসেনা এবং এনসিপি’র দখল নিয়েছিলেন, সেই কৌশলই এ ক্ষেত্রে বিদ্রোহী তৃণমূল কংগ্রেস নিয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
গত সপ্তাহে নিউ টাউনের এক হোটেলে বৈঠক করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে ‘তৃণমূল কংগ্রেসের’ জাতীয় কর্মসমিতি গঠন করে ফেলেছিলেন রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার সহযোগীরা।
সূত্রের খবর, ঋতব্রতপন্থিদের সঙ্গে কথা বলার পরে জাতীয় নির্বাচন কমিশন মমতাপন্থি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিদেরও ডেকে পাঠিয়ে তাদের বক্তব্য জানতে চাইবে। তার পরই সিদ্ধান্ত জানাবে কমিশন।
ঋতব্রতের দাবি, দলের নামে ‘তৃণমূল’ থাকলেও দলটা পারিবারিক হয়ে গিয়েছিল। তারা দলটাকে আবার তৃণমূল স্তরে ফেরাতে চান বলে জানিয়েছেন। ঋতব্রত বলেন, “আমাদের লড়াই ব্যক্তি এবং পরিবারের বিরুদ্ধে।’’ তার পরেই অভিষেকের নাম না করে তার কটাক্ষ, “চার্টার্ড ব্যুরোক্র্যাটের কথায় দল চলবে না।” এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করে অভিষেকের চার্টার্ড বিমানে যাতায়াত করা নিয়েই ঋতব্রত কটাক্ষ করতে চেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
ঋতব্রতদের এই পদক্ষেপকে অবশ্য কটাক্ষ করে মমতাপন্থি তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, “তৃণমূল মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমস্ত কর্মী এবং সমর্থক তার সঙ্গেই আছেন। যারা আজকে নিজেদের ‘আসল’ বলে দাবি করছেন, দু’মাস আগে কমিশনে তারা যে হলফনামা দিয়েছিলেন, তার নির্দিষ্ট দু’টি ফরমে মমতাদি এবং অভিষেকের সই ছিল। আজকে ভাড়াটিয়া নিজেকে বাড়ির মালিক বলে দাবি করলে কী হবে?” পরে দিল্লিতে সংবাদ বৈঠক করে রাজ্যসভার সাংসদ সাগরিকা ঘোষ এবং লোকসভার সাংসদ সৌগত রায় ঋতব্রতদের কমিশন-সফরকে ‘অবৈধ’ বলে বণর্না করেন। দুই তৃণমূল সাংসদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নির্বাচন কমিশনকে পরিচালনা করছেন।
তাদের প্রশ্ন, তৃণমূল কংগ্রেস ঋতব্রতদের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত না করা সত্ত্বেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে তাদের সময় দিলেন? বিজেপিই ঋতব্রতদের পরিচালনা করছে বলে দাবি মমতাপন্থি তৃণমূল কংগ্রেসের।
এদিকে, দলের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের কথা উল্লেখ করে তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ? করার আবেদন জানিয়েছিলেন দলের সাবেক কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাস। ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে ওই অ্যাকাউন্টের লেনদেন বন্ধ রাখতে বলেছিলেন তিনি। পরে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ? করার আবেদন জানিয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এক নেতা। পুলিশ সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনটি অ্যাকাউন্টে জমা থাকা তৃণমূলের ৪৪০ কোটি টাকা আপাতত তোলা যাবে না বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর পরে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় মমতাপন্থি তৃণমূল কংগ্রেস। বৃহস্পতিবার আদালত তৃণমূল কংগ্রেসের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ? হওয়া নিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চেয়েছে। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে হলফনামা আকারে তা জানাতে বলা হয়েছে। রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে পুলিশকেও। বৃহস্পতিবারের শুনানিতে মমতাপন্থি তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে দাবি করা হয়েছে, মোট ৮টি অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ?’ হয়েছে।
অন্যদিকে দলের নাম, প্রতীক ভাঁড়িয়ে কর্মীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টার অভিযোগ তুলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন, অরূপ রায়, জাভেদ খান, বিপ্লব মিত্রের বিরুদ্ধে কালীঘাট এবং নিউ টাউন থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন মমতাপন্থি তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী দোলা সেন।