Image description

রাজধানী ঢাকা এখন শুধু যানজট, ধুলা আর কংক্রিটের শহর নয়; এটি ক্রমেই গাছহীন এক বিপজ্জনক নগরীতে পরিণত হচ্ছে। যেখানে একজন মানুষের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহের জন্য তিনটি প্রাপ্তবয়স্ক গাছ প্রয়োজন, সেখানে ঢাকায় প্রতি ২৮ জনের জন্য রয়েছে মাত্র একটি। ফলে বিশুদ্ধ বাতাসের সংকট, বায়ুদূষণ, অতিরিক্ত তাপ এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগ- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি। পরিবেশবিদ, বন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মতে, রাজধানীর সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি এখন গাছের ভয়াবহ ঘাটতি। এর প্রভাব শুধু পরিবেশেই নয়, মানুষের ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, এমনকি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে।

জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতে বসবাস করছে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ। অন্যদিকে বন বিভাগ ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস ফরেস্ট সার্ভিস পরিচালিত ‘আরবান ট্রি ইনভেনটরি অব ঢাকা সিটি’ জরিপে দেখা গেছে, ৩০৬ বর্গকিলোমিটারের পুরো ঢাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে গাছ রয়েছে মাত্র ১৩ লাখ। অর্থাৎ প্রতি ২৮ জন মানুষের জন্য রয়েছে একটি গাছ। অথচ, বছরের পর বছর ধরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ করে ঢাকা শহরে গাছ লাগানো হয়েছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত শ্বাস-প্রশ্বাসের হিসাব অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক গড়ে প্রায় ৫৫০ লিটার বিশুদ্ধ অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। পরিবেশবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, একজন মানুষের এ চাহিদা পূরণে গড়ে তিনটি পূর্ণবয়স্ক গাছকে আদর্শ ধরা যায়। সেই হিসাবে বর্তমান ঢাকার মানুষের জন্য প্রয়োজন প্রায় সাড়ে ১০ কোটি গাছ। অথচ বাস্তবে রয়েছে মাত্র ১৩ লাখ। বর্তমান সরকার ৫ বছরে ঢাকাসহ অন্যান্য নগরে ১ কোটি ২৫ লাখ চারা লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এ সবগুলো চারা ঢাকা শহরে লাগানো হলেও নয় কোটির বেশি গাছের সংকট থাকবে। এ ছাড়া এসব চারা থেকে পূর্ণ সুবিধা পেতে লাগবে ৫-১০ বছর। বৃক্ষ জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডার টরেন্টোর প্রায় ২৭ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের আন্টালান্টায় ৩৭ শতাংশ, নিউইয়র্কের ২১ শতাংশের বেশি এলাকা বৃক্ষ আচ্ছাদিত থাকলেও ঢাকায় বৃক্ষ আচ্ছাদন ১১ শতাংশের মতো। ঢাকার গড় বৃক্ষ আচ্ছাদন দেশের জাতীয় গড়ের অর্ধেকের কম।  গবেষকদের মতে, নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় অন্তত জাতীয় গড়ে পৌঁছানো এবং দীর্ঘমেয়াদে ৩০ শতাংশ বৃক্ষ আচ্ছাদন নিশ্চিত করা জরুরি।

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন সেভারসের প্রতিষ্ঠাতা এহসান রনি বলেন, ঢাকায় গাছ লাগানোর জায়গা খুব নেই। প্রথমে পুরোনো গাছ বাঁচাতে হবে। ৫ লাখ নতুন ভবনের ছাদে ২০টি করে গাছ লাগালে ১ কোটি গাছ বাড়বে। এ ছাড়া ভার্টিক্যাল গার্ডেনিংয়ের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। সব খাল, লেক, নদীর পাড় ও সড়কদ্বীপে গাছ লাগাতে হবে।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) এর নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পান্থকুঞ্জ পার্কের গাছগুলো বাঁচাতে মানুষ তিন মাস আন্দোলন করল। অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো রক্ষায় কিছু করল না। বর্তমান সরকারও করছে না। প্রকল্পের নামে গাছ কাটা বন্ধ না হলে, সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চিন্তায় পরিবর্তন না এলে ঢাকায় সবুজ থাকবে না। পুরোনো গাছ সংরক্ষণ এবং প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে বাধ্যতামূলক সবুজায়ন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

গবেষণায় হিসাব করা হয়েছে, ঢাকার বিদ্যমান গাছ বছরে প্রায় ৫৩৮ দশমিক ৫ মেট্রিক টন বায়ুদূষণকারী পদার্থ অপসারণ এবং প্রায় ৫৩ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন অক্সিজেন উৎপাদন করে। কিন্তু বর্তমান জনসংখ্যার জন্য বছরে প্রয়োজন প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ মেট্রিক টন অক্সিজেন। যদিও পৃথিবীর অক্সিজেনের বড় অংশ সমুদ্রের ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবাল থেকে আসে, তবু শহরের মানুষের জন্য বায়ু পরিশোধন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রক্ষায় নগরীর গাছের  বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাছের সংকটে ঢাকায় দুটি বড় পরিবেশগত বিপদ তৈরি হয়েছে।

প্রথমত, বাতাস থেকে ধূলিকণা, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও অন্যান্য দূষক শোষণ করার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, সিওপিডি, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ছে। অক্সিজেন ঘাটতিতে স্মৃতিশক্তি, মেধা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সবুজের অভাবে নগরীতে কংক্রিটের ভবন ও সড়ক অতিরিক্ত তাপ ধরে রাখায় আশপাশের এলাকার তুলনায় ঢাকার তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি থাকছে, যা গরমজনিত অসুস্থতা ও শ্বাসকষ্টকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।