ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ১ জুলাই, শুক্রবার। সন্ধ্যার আলো নিভতেই রাজধানী ঢাকার গুলশানের ৭৯ নম্বর রোড যায় থমকে। কূটনৈতিক পাড়ার ‘হলি আর্টিজান বেকারি’ যেন রূপ নেয় এক জীবন্ত নরকে। আচমকা স্তব্ধ হয় চারপাশ। শুরু হয় এক বিভীষিকাময় রক্তাক্ত অধ্যায়। জঙ্গিদের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয় দেশি-বিদেশি ২০ জনের শরীর। পুরো দেশ তাকিয়ে ছিল গুলশানের দিকে। রুদ্ধশ্বাস সেই রাতের ভয়াল স্মৃতি আজ ১০ বছর পরও তাজা। মনে পড়লেই এখনো শিউরে ওঠতে হয়।
হলি আর্টিজান হত্যাযজ্ঞের পর পেরিয়ে গেছে এক দশক। এ ঘটনায় হওয়া মামলার পার হয়েছে আইনি প্রক্রিয়ার দুটি ধাপ। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর রায় দেয় ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। আট আসামির মধ্যে ৭ জনকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। খালাস পান একজন।
এরপর মামলাটি আসে হাইকোর্টে। ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর আসে নতুন রায়। ৭ জঙ্গির সাজা পরিবর্তন করে উচ্চ আদালত। মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দেওয়া হয় আমৃত্যু কারাদণ্ড। তবে এখনো শেষ হয়নি আইনি লড়াই। আসামিপক্ষ আপিল করেছে এই রায়ের বিরুদ্ধে। চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় ঝুলে আছে বিচার।
হলি আর্টিজান বেকারিতে রাতভর চলা জিম্মি দশার অবসান ঘটে পরদিন সকালে, সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে। ওই অভিযানে নিহত হয় হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি। জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জন জিম্মিকে।
ওই জঙ্গি হামলায় নিহতদের মধ্যে ইতালির নাগরিক ছিলেন ৯ জন, জাপানের ৭ জন, ভারতের একজন ও বাংলাদেশি ৩ জন। যার মধ্যে জিম্মিদের মুক্ত করার অভিযানে জঙ্গিদের হামলায় প্রাণ হারান পুলিশের দুই কর্মকর্তা। রক্তক্ষয়ী এই জঙ্গি হামলায় সেই রাতে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল পুরো দেশ।
মৃত্যুদণ্ড থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ড
দেশ-বিদেশে আলোড়ন তোলা ওই ঘটনার জেরে গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। তদন্ত শেষে আট আসামির বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর অভিযোগ গঠন হয়। টানা এক বছর বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঘোষণা হয় রায়। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায়ের পর নিয়ম অনুসারে ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স ও খালাস চেয়ে করা আসামিদের জেল আপিল শুনানির জন্য মামলার নথিপত্র বিচারিক আদালত থেকে আসে হাইকোর্টে। বিচারিক আদালতের এসব নথির মধ্যে মামলার এজাহার, জব্দ তালিকা, চার্জশিট, সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও রায়সহ নথিপত্র হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় করা হয় জমা।
২০২৩ সালের শুরুর দিকে হাইকোর্টে মামলাটির ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুরু হয় শুনানি। যা শেষ হয় একই বছরের ১১ অক্টোবর। পরে ৩০ অক্টোবর রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সাত জঙ্গিকে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দেয় হাইকোর্ট।
দণ্ডিতরা হলো— জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন।
কমান্ডো অপারেশনে নিহত ৫ জনকেও মৃত্যুদণ্ড
আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়, ‘হলি আর্টিজানে কমান্ডো অপারেশনে মৃত জঙ্গি রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম এবং শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল হামলায় অংশ নেয় সরাসরি। ২০ জনকে হত্যা করেছে বলে প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্য থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(১)(ক)(অ) ধারার অপরাধে ওই ৫ জন অপরাধী।
স্বীকৃতমতে, ওই ৫ সন্ত্রাসী ঘটনার পরে ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে যদি কেউ বেঁচে থাকতেন তাহলে তাকে এই আইনের অধীনে বিচার শেষে ৬(১)(ক)(অ) ধারার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ৬(২)(অ) ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেত।’
এই প্রতিবেদকের চোখে বিভীষিকাময় সেই রাত
বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তখন। গণযোগাযোগে পড়াশোনার তাগিদে সংবাদ দেখা ও শোনার আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। ওইদিন রাত প্রায় ৯টা ছুঁইছুঁই, তখন টিভির স্ক্রলে লেখা আসলো— গুলশানের একটি রেঁস্তোরায় জঙ্গি হামলা হয়েছে। দেশি-বিদেশি অনেক মানুষ সেখানে আটকা পড়েছে। গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। হাতে ছিল ওয়ালটনের একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন, বিষয়টি বিস্তারিত দেখতে ভিজিট করি গুলশানের ঘটনার বিষয়ে। কিন্তু তখনো ওই জঙ্গি হামলা সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না অনলাইনে।
মিরপুর-১-এর সি ব্লকের আকবর মসজিদের পাশের একটি দোকান থেকে বের হয়ে রাকিব নামে এক যুবক ফোন দেয় তার বোনের কাছে। আগ্রহ প্রকাশ করে জানতে চাই— তার কেউ হলি আর্টিজান বেকারিতে আটকা পড়েছে কি-না? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ওই রেঁস্তোরার পাশের একটি ভবনে ভাড়া থাকে তার বড় বোন।
বড় বোনের ভাষ্যে বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনাটা ছিল এরকম— ‘আমাকে আমার ড্রাইভার বললেন, ‘আপা আপনি এখন বেরোবেন না, নিচে গোলাগুলি চলছে।’ তারপর দেখি আমার ড্রয়িং রুমের জানালার কাঁচ ফেটে গেল। তারপর থেকে অনবরত গুলির শব্দ শুনতে পাই। এরপর আমার মেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। আমরা সবাই কান্নাকাটি শুরু করি। কারণ খুবই আতঙ্কজনক একটা পরিস্থিতি চলছিল।’
হামলার বিস্তার আরও বাড়তে থাকে। দেশ থেকে বিদেশ, সবার চোখ হলি আর্টিজান বেকারির জঙ্গি হামলার দিকে। কতজনকে জিম্মি করেছে, কতজনকে মেরে ফেলা হয়েছে— এমন বহু প্রশ্ন ওই রাতে সবার মুখে মুখে। এরই মধ্যে খবর আসলো জঙ্গিদের গুলিতে মারা পড়েছেন পুলিশের দুই সদস্য। তখন ভয় বাড়তে শুরু করে আরও। তার অর্থ জঙ্গিদের সংখ্যা অনেক ও তারা শক্তিশালী।
রাত ১০টার দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক এক টুইটে লিখেন— ‘পুলিশ ইজ সারাউন্ডিং দ্য এরিয়া, গানফায়ার স্টিল অন’।
পরদিন সকালে কমান্ডো অভিযান
রাতভর হোলি আর্টিজান বেকারি সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখার পর ২ জুলাই সকাল সাড়ে ৭টায় সেনাবাহিনীর কমান্ডো দল অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। ৭টা ৪৫ মিনিটে কমান্ডো বাহিনী অভিযান শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দলের সদস্যরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢোকে। এ সময় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।
সকাল সোয়া ৮টায় বেকারি থেকে প্রথম দফায় নারী ও শিশুসহ ৬ জনকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। ৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভিযানকারীরা। বিশেষজ্ঞ দল ভবনের ভেতর বিস্ফোরকের খোঁজে শুরু করে তল্লাশি। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে গোয়েন্দারা। ৯টা ১৫ মিনিটে শেষ হয় অভিযান। কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের।
সকাল ১০টায় ৪ জন বিদেশিসহ ১৩ জন জীবিত উদ্ধারের খবর জানানো হয়। বেকারির ভেতরে অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচজনের মরদেহ পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ।

