Image description

পলাশীর যুদ্ধ হয়েছিল মূলত বাংলার অর্থ-সম্পদ লুট করার জন্য বলে মন্তব্য করেছেন দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান।

 

মঙ্গলবার বিকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ আয়োজিত ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ: ইতিহাসের শিক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এই মন্তব্য করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, “১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় কোনো সাধারণ যুদ্ধ ছিল না, তা ছিল যুদ্ধের নামে একটি নাটক। তৎকালীন মীর জাফর, জগতশেঠদের মতো পুঁজিপতি ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে হাত মিলিয়েছিল। ইংরেজদের সেই লুণ্ঠনের ফলেই পরবর্তীতে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মতো ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল। এই দুর্ভিক্ষে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ না খেয়ে মারা যান। ১৭৭০ সালের আগে বৈশ্বিক জিডিপির ২৫ শতাংশ উৎপাদন হতো এই ভারতবর্ষে, যা এই লুণ্ঠন ও দুর্ভিক্ষের পর মাত্র ৪ শতাংশে নেমে আসে। ব্রিটিশদের এই লুণ্ঠনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, আমাদের ভারতীয় শব্দ ‘লুট’ ইংরেজি অভিধানেও স্থান করে নেয় তখন।

পলাশীর যুদ্ধের পর নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে কলঙ্কিত করতে এবং নিজেদের অন্যায়কে বৈধতা দিতে ব্রিটিশরা ব্যাপক চরিত্রহননের চেষ্টা চালায়। এর মধ্যে অন্যতম একটি মিথ্যা গল্প হলো হলওয়েল নামের এক ব্রিটিশ সৈনিকের ছড়ানো কলকাতার ‘অন্ধকূপ হত্যা’ কাহিনী।

অথচ ব্রিটিশদের করা সেই ঐতিহাসিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং তরুণ নবাবের পক্ষে আমরা আজ পর্যন্ত কোনো শক্তিশালী একাডেমিক কাজ করতে পারিনি।” তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলার ওপর করা ঐতিহাসিক মিথ্যাচারের সত্যতা উন্মোচনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে বিশেষ পিএইচডি প্রজেক্ট চালুর আহ্বান জানান।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “১৭৫৭ সালে ক্ষমতা হারানোর পর মুসলমানদের স্বাধীন ভূখণ্ড পেতে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ১৯০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাই ইতিহাস থেকে ১৯৪৭ সালকে বাদ দিলে তা হবে বড় বিকৃতি। এরপর ১৯৭১ সালে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বাঙালি মুসলমানরা তাদের নিজস্ব সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পেয়েছে।”

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে ড. মাহমুদুর রহমান তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, “২০২৪ সালে আমাদের তরুণ প্রজন্ম কোনো বিদেশি সাহায্য ছাড়াই বুক পেতে দিয়ে এ দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে। বিগত ১৫ বছর বাংলাদেশ একটি প্রতিবেশী দেশের অলিখিত উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল, যা থেকে ছাত্র-জনতা আমাদের মুক্ত করেছে।”

তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে, চব্বিশের ঐতিহাসিক বিপ্লবের পর আজ বিপ্লবীদের নিজেদের মধ্যেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বিভেদ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে পরাজিত ফ্যাসিবাদ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু একে অপরকে শত্রু ভাবা যাবে না। আপনারা রাজনৈতিক প্রতিযোগী হতে পারেন, কিন্তু শত্রু নন। নিজেদের মধ্যকার ঐক্য বজায় না রাখলে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন হবে।”

জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলামের সঞ্চালনায় এবং ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। এছাড়া বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, অধ্যাপক ড. খো: লুৎফুল এলাহী এবং সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. সালাহউদ্দিন।