অভাব আর অনটন থেকে উঠে এসে সোমবার জার্মানির বিপক্ষে টাইব্রেকারে প্যারাগুয়ের জয়ের নায়ক হয়ে উঠলেন ওর্লান্দো গিল। ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার এই গোলরক্ষক দুটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে নিজের দেশের ফুটবল ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো নকআউট নিশ্চিত করেছেন।
২৬ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা পারফর্মার হলেও বাস্তব চিত্র ছিল অন্যরকম।
মাত্র চার বছর আগের কথা, যখন ওর্লান্দো গিলের ছেলের অকাল জন্ম হয়। সে সময় পরিবার চালানোর মতো কোনো অর্থই তাদের কাছে ছিল না।
প্যারাগুয়ের ক্লাব ‘ক্লাব ১৩ দে জুনিও’ এবং ‘সিএস সান লরেঞ্জো’র যুব দলে বেড়ে ওঠা গিলের ২০১৯ সালের অনূর্ধ্ব-২০ দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপের স্কোয়াডে জায়গা হয়েছিল। ২০২০ সালে সান লরেঞ্জোর মূল দলে তার অভিষেক হলেও ২০২২ সাল পর্যন্ত মাত্র দুটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময়েই তার স্ত্রী মেলিসা আভালোস অন্তঃসত্ত্বা হন।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে তাদের সন্তান হওয়ার কথা থাকলেও স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে নভেম্বরেই মেলিসাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। জটিল অস্ত্রোপচারের পর তাদের ছেলে লাউতারো পৃথিবীতে আসে এবং তাকে আইসিইউ-তে রাখা হয়।
ক্রিসমাসের সময় তারা বাড়ি ফিরলেও আর্থিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। গত বছর এক আবেগঘন পোস্টে মেলিসা জানান, ‘বাড়িতে আমাদের কিছুই ছিল না। ওর্লান্দো তখন খরচ মেটাতে তার ক্লাবের গিয়ার এবং সরঞ্জাম বিক্রি করতে শুরু করে। আমাদের সন্তান জীবনের জন্য লড়াই করছিল, আর তার বাবা পাশে ছিল সবসময়। সে তার জামাকাপড়, জুতো এমনকি অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের জার্সিটিও বিক্রি করে দিয়েছিল, যা সে স্মৃতি হিসেবেও নিজের কাছে রাখতে পারেনি।’
সন্তানের জন্মের এক বছর পর এবং মাত্র দুটি পেশাদার ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও গিলের জীবনে আসে এক অভাবনীয় সুযোগ। আর্জেন্টিনার শীর্ষ লিগের ক্লাব সান লরেঞ্জো তাকে ধারে দলে নেয়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে তিনি ক্লাবের নিয়মিত গোলরক্ষক হয়ে ওঠেন এবং প্যারাগুয়ের জাতীয় দলের কোচ গুস্তাভো আলফারোর নজর কাড়েন।
গত সেপ্টেম্বরে পেরুর বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলে হারলেও গিল দমে যাননি। পরের তিন ম্যাচে তিনি মাত্র একটি গোল হজম করেছেন এবং প্রতিপক্ষের ১৭টি অন-টার্গেট শটের ১৬টিই রুখে দিয়েছেন।
জার্মানির বিপক্ষে শেষ বত্রিশের এই গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে গিল কেবল দারুণ গোলকিপিং-ই করেননি, টাইব্রেকারে দুটি চমৎকার সেভ করে ফিফার ‘প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার জিতে নেন। এই অর্জনের পর তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
গিল এই পুরস্কারটি তার পরিবার এবং বিশেষ করে তার ভাগ্নে আলেকজান্ডারকে উৎসর্গ করেছেন, যে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিজের ছেলের জন্মকালীন লড়াই যেমন তাকে সাহস জুগিয়েছিল, এখন দূর থেকে ঠিক তেমনিভাবে ভাগ্নেকেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিচ্ছেন এই প্যারাগুয়ে গোলরক্ষক।
পুরস্কার হাতে নিয়ে গিল বলেন, ‘আলেকজান্ডার, এই ট্রফিটি তোমার জন্য। আশা করি তুমি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। তোমার মামা দূর থেকে সবসময় তোমাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।’