Image description

ইঙ্গিতপূর্ণ সাদা-কালো পতাকা ইস্যুতে কেউ যাতে অরাজকতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে ব্যাপারে পুলিশকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় এই নির্দেশনা দেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির।

গতকাল রোববার পুলিশ সদর দপ্তরের সভায় তিনি বলেন, সাদা-কালো পতাকা ইস্যু কাজে লাগিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বা অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা হলে কঠোর হাতে দমন করতে হবে।

আইজিপির সভাপতিত্বে সভায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন এক কর্মকর্তা স্ট্রিমকে জানান, সারা দেশে সাদা-কালো পতাকা টানানো এবং শোডাউনের বিষয় সভায় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। আইজিপি পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেউ যাতে দেশে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সুযোগ নিতে না পারে, সে ব্যাপারে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতা বাড়ানো এবং নিয়মিত তথ্য সরবরাহের ওপর জোর দেন আইজিপি। যাঁরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

গত ১৩ জুন ‘আল কুরআনের দারস’ নামের ফেসবুক পেজে ‘বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিদেশি পতাকার পরিবর্তে কালেমার পতাকা টানানোর আহ্বান’ ক্যাপশনে পোস্ট করা ভিডিওতে মুফতি হারুন ইজহার বলেছিলেন, ‘আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগায়ে দেবেন। এখন যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে, তাহলে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল– এগুলোর সব পতাকা নামাতে হবে। এগুলো যেখানে থাকবে, কালেমার পতাকাও থাকবে আমাদের।’

সেখানে তিনি আরও বলেন, ‘এই যে আর্জেন্টিনা, তারপরে... এই যে আপনার বদমায়েশি শুরু হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের তরুণরা কালেমার পতাকা শুরু করেছে।’

ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনার মধ্যে হারুন ইজহারের এই বক্তব্যের পর বিভিন্ন স্থানে সাদা এবং কালো পতাকা লাগানো শুরু হয়। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়, স্থাপনা, অলিগলি ছেয়ে যায়। এমনকি পতাকা হাতে এখনো বিভিন্ন স্থানে শোডাউন ও মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এসব পতাকার সঙ্গে আল কায়েদা, আইএসআইএস, তালেবান, হিজবুত তাহরীরের মতো সংগঠনের পতাকার নকশার মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন। তাঁরা সংগঠিত এই পতাকা কর্মসূচিকে নিজেদের অবস্থান পোক্ত এবং দেশের সরকারব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেন।

সাদা-কালো পতাকা ইস্যু সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এলে নড়েচড়ে বসে সরকার। পতাকা টানানোর পেছনে কারা, তা সন্ধানে মাঠে নামে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।

এমন প্রেক্ষাপটে নিজের অবস্থান তুলে ধরে গত ২৭ জুন রাতে একই ফেসবুক পেজে ভিডিও বক্তব্যে হারুন ইজহার পরিচিত উগ্রবাদী সংগঠনের পতাকার নকশার বাইরে ভিন্ন ধাঁচে কালেমা খচিত পতাকা টানানোর আহ্বান জানান।

তরুণদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমরা বলছিলাম– যেখানে যেখানে বিদেশি কুফফারদের পতাকা আছে, বিকল্প হিসেবে সেখানে আপনারা কালেমা খচিত পতাকার মাধ্যমে কাউন্টার করবেন। পরে দেখলাম, হোন্ডা নিয়ে শোডাউন, মিছিল শুরু হয়েছে। তো এই ফ্যান্টাসির ব্যাপারে আমার বক্তব্য– ভাই, এত যে আপনারা অতি উৎসাহ দেখাচ্ছেন, আপনারা কি ওই রকম আমলদার? পতাকা ও হোন্ডা নিয়ে শোডাউনে যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, সেই উৎসাহ-উদ্দীপনায় আপনি কি কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদ) পড়েছেন? মাওলানা সাহেব, উত্তরগুলো খারাপ লাগবে আপনাদের।’

এ ছাড়া মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় পুলিশের শরীরে অনস্পট ক্যামেরা ব্যবহার, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধ দমনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

বিভ্রান্তদের কাউন্সেলিং করবে পুলিশ

পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন স্থানে সাদা-কালো পতাকা টানানো এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের বিষয়টি শুরু থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন তাঁরা। মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য ও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ইতোমধ্যে এই কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে যারা বিভ্রান্ত হয়ে সম্পৃক্ত হয়েছেন, তাদের কাউন্সেলিং করার মাধ্যমে সংশোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।

নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টিকে ঢালাওভাবে আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে না। মনস্তাত্ত্বিক ও সচেতনতামূলক দিকও রয়েছে। অনেকেই অজ্ঞতা, আবেগ বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে জড়িয়ে পড়েছেন। যারা বিভ্রান্ত হয়ে জড়িয়েছেন, তাদের শাস্তির মুখোমুখি না করে কাউন্সেলিং করা হবে।

এরপরও যারা সংশোধন হবে না– তাদের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া গেলে, পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন স্ট্রিমকে বলেন, সাদা-কালো পতাকার বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। এর নেপথ্যে কারা, তাদের উদ্দেশ্য কী, তদন্ত করা হচ্ছে। খারাপ কোনো উদ্দেশ্য পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রোববার পুলিশ সদর দপ্তরে সভা হয়েছে। সেখানে পতাকা ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আইজিপি যেকোনো ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা রুখে দিতে বাহিনীর সদস্যদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।