Image description

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে (বিওপি) নতুন চাপ তৈরি করছে ‘প্রাইমারি ইনকাম’ বা প্রাথমিক আয় খাত। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা সেকেন্ডারি ইনকামে বড় প্রবৃদ্ধি থাকলেও, বহিরাগত খাতের এ প্রাথমিক আয়ে ক্রেডিটের চেয়ে ডেবিট বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে প্রাথমিক আয় খাতে নিট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩২ মিলিয়ন ডলার, যা দেশের সামগ্রিক চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে প্রাইমারি ইনকাম বা প্রাথমিক আয় খাতে ডলার আসে মূলত তিনটি খাত থেকে, যেটি ‘ক্রেডিট’ হিসেবে জমা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রিজার্ভের সুদ ও মুনাফা, স্বল্পমেয়াদি শ্রম ও সেবা আয় এবং বিদেশি বিনিয়োগের লভ্যাংশ। অর্থাৎ, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের যে অংশটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বন্ড, মার্কিন ট্রেজারি ও বিদেশি ব্যাংকে বিনিয়োগ করা রয়েছে, সেখান থেকে অর্জিত সুদ ক্রেডিটে জমা হয়। যারা বিদেশে স্বল্পমেয়াদি (এক বছরের কম) চুক্তিভিত্তিক কাজ করে বা বিভিন্ন সেবার বিপরীতে কনসালটেন্সি ফি নেয় এবং সীমান্ত এলাকায় শ্রম বা সহায়তা করে আয় করে- সেই কর্মজীবীদের আয় প্রাইমারি ইনকামে যুক্ত হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা শাখা বা ইক্যুইটি বিনিয়োগ থেকে অর্জিত লভ্যাংশ ব্যালেন্স অব পেমেন্টের প্রাথমিক আয়ে ক্রেডিট হিসেবে জমা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রাইমারি ইনকামে ক্রেডিটের যে তিনটি খাত, সেই তিনটিতেই দুর্বলতা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের বড় একটি অংশ বিনিয়োগের বাইরে রাখতে হয় খাদ্যসহ জরুরি পণ্য আমদানি ব্যয় মেটাতে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাধ্য হয়ে ডলার ধরে রাখছে ‘লিকুইডিটি ট্রাঞ্চ’ বা তরল আকারে, যাতে যেকোনো মুহূর্তে পেমেন্ট করা যায়। ফলে লাভজনক বন্ড বা ট্রেজারিতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করার মতো উদ্বৃত্ত ডলার থাকছেই না। এতে করে ক্রেডিটের খাতে ডলার যোগ হচ্ছে কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল প্রান্তিকে প্রাথমিক আয় খাতে বাংলাদেশের মোট ক্রেডিট বা প্রাপ্তি ছিল মাত্র ২ হাজার ৩০৫ মিলিয়ন ডলার।

যে কারণে ডেবিট বাড়ছে : বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে প্রাথমিক আয়ে ক্রেডিটের প্রায় তিনগুণ হয়েছে ডেবিট। আলোচ্য সময়ে রিজার্ভ থেকে প্রায় ৬ হাজার ২৩৫ মিলিয়ন ডলার বেরিয়ে গেছে দায় বা ডেবিট হিসেবে। এর প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ, ১ হাজার ৯৩৫ মিলিয়ন ডলার গেছে সরকারের বৈদেশিক ঋণের সুদ মেটাতে। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত বছরগুলোতে নেওয়া কঠিন শর্তের স্বল্পমেয়াদি ও বাণিজ্যিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় সরকারের অফিশিয়াল সুদের এ দায় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। যে কারণে ডেবিট বা দায়ও বড় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু যে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যালান্স অব পেমেন্টে চাপ বাড়ছে তাই নয়, বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতা ও রেমিট্যান্স, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও ক্যাপিটাল গেইনস, বিদেশি ব্যাংকের শাখা এবং অন্যান্য আর্থিক সেবার ফি ডেবিট হিসেবে বেরিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত, টেক্সটাইল, বহুজাতিক কোম্পানি, মেগা প্রকল্প এবং করপোরেট হাউসগুলোতে ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার এক্সপার্ট ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কাজ করেন। আইএমএফের নিয়ম অনুযায়ী, এঁরা যদি এক বছরের কম সময় ধরে এখানে চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন, তবে তাঁদের পুরো বেতন-ভাতা ডেবিট হয়। আর যদি এক বছরের বেশিও থাকেন, তবে তাঁদের বেতনের যে অংশটি তাঁরা অফিশিয়াল চ্যানেলে নিজ দেশে পাঠিয়ে দেন, তার একটি বড় অংশ সামষ্টিক অর্থনীতির এই খাতের সমীকরণে চাপ সৃষ্টি করে।

এ ছাড়া শেয়ার বাজারে যেসব বিদেশি বিনিয়োগকারী টাকা খাটান, তাঁরা যখন কোনো লভ্যাংশ পান, কিংবা শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেন- সেই টাকাটা যখন তাঁরা নিজ দেশে নিয়ে যান, তখন তা এই প্রাইমারি ইনকামের ডেবিট হিসেবে বেরিয়ে যায়। বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলো (যেমন : স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসি) বা মেটলাইফের মতো বিদেশি ইনসিওরেন্স কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ব্যবসা করে যে নিট মুনাফা পায়, তা যখন তাদের মূল হেডকোয়ার্টারে রেমিট বা ফেরত পাঠায়, সেটিও এই প্রাইমারি ইনকামের ডেবিট লাইনে গিয়ে জমা হয়। এভাবেই ডেবিটের অঙ্ক বাড়তে থাকে। চাপ পড়তে থাকে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, আমাদের সমস্যা হলো শুধু সরকারের মেগা প্রজেক্টের ঋণের সুদই বাড়ছে না, সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের সুদের হার এবং বিদেশি কর্মীদের পেছনে ডলারের আউটফ্লো-সব মিলে ডেবিটের পাল্লাটাকে দিনে দিনে বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ছায়া না থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতো। এখন সময় এসেছে মেগা প্রকল্পের জন্য চড়া সুদের বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়া কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি এবং সহজ শর্তের ঋণের দিকে মনোযোগ দেওয়ার। অন্যথায় রেমিট্যান্সের এই চোখ ধাঁধানো অর্জনও প্রাইমারি ইনকামের ঘাটতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে পারে।