২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনকালে দেশের অনেক সংবাদমাধ্যমে বিরোধী দল ও মতের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রায়ই তথ্য-প্রমাণহীন প্রোপাগান্ডা প্রতিবেদন প্রকাশিত হতো। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে প্রকাশিত তথ্য-প্রমাণহীন ও বিতর্কিত অনেক প্রতিবেদন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট থেকে নীরবে সরিয়ে নেয়।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে মূলধারার বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে তৎকালীন বিরোধীগুলোকে নিয়ে সংঘবদ্ধ প্রোপাগান্ডা রিপোর্ট সিরিজ আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এসব রিপোর্টে পর্যান্ত তথ্য-প্রমাণের বদলে নামহীন সূত্রের বরাত দিয়ে বিরোধী দল ও নেতাদের নিয়ে কুৎসা প্রচার করা হয়েছে।
এরকম একটি সিরিজ রিপোর্ট প্রকাশ করে বাংলা ট্রিবিউন ও বাংলাদেশ প্রতিদিন। গতকাল দ্য ডিসেন্ট বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার ওয়েবসাইটে পাওয়া ‘দেশের রাজনীতিতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা’ নামের সিরিজ প্রোপাগান্ডা রিপোর্টগুলো (২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত) নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই সরিয়ে নেয়া হয়।
তবে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সরিয়ে ফেলা রিপোর্টগুলো প্রথম প্রকাশ করেছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি কাজী নাবিল আহমেদের জেমকন গ্রুপের মালিকানাধীন বাংলা ট্রিবিউন।

ট্রিবিউন তাদের ৫টি প্রতিবেদনের সিরিজের নাম দিয়েছিল ‘রাজনীতিতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা’।
দুই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিবেদনগুলো প্রথমে প্রকাশ করেছিল বাংলা ট্রিবিউন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রতিদিন সেগুলো প্রায় হুবহু কপি করে প্রকাশ করে। ৫টি প্রতিবেদনের শিরোনাম, সিরিজের নাম এবং ভেতরের বেশিরভাগ প্যারা হুবহু মিলে গেলেও বাংলাদেশ প্রতিদিন বাংলা ট্রিবিউনের সৌজন্য ছাড়াই সেগুলো প্রকাশ করেছিল।
বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনগুলোতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার দল বিএনপি, অন্য বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, ওই বছর হয়ে যাওয়া কোটা আন্দোলন নিয়ে প্রমাণবিহীন বিভিন্ন দাবি করা হয়। বিশেষ করে প্রতিটা রিপোর্টে দেখানোর চেষ্টা করা হয়, কীভাবে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এসব দল মিলে সমন্বয় ও বৈঠক করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

এসব দাবির ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে মূলত ‘গোয়েন্দা সূত্র’, ‘অনুসন্ধানে জানা গেছে’, ‘নথিপত্রে পাওয়া গেছে’ কিংবা ‘সূত্র বলছে’ জাতীয় বর্ণনার ওপর নির্ভর করা হয়; কিন্তু দাবিগুলোর পক্ষে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
২০১৮ সালের ১৯ থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলা ট্রিবিউন ‘রাজনীতিতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা’ সিরিজের পাঁচটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত ‘দুবাই থেকে কলকাঠি নাড়ছে আইএসআই’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দুবাইয়ে অবস্থানরত আইএসআইয়ের একজন এজেন্টের মাধ্যমে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে এবং লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের সঙ্গেও ওই যোগাযোগ রয়েছে।
একই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইএসআই নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং বিএনপির কাছে প্রার্থী তালিকাও পৌঁছে দিয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন এসব অভিযোগকে "মিথ্যা, বানোয়াট ও ভুয়া" বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং জামায়াতের নেতারাও অভিযোগ অস্বীকার করেন।
একই দিন প্রকাশিত দ্বিতীয় পর্ব ‘আইএসআইয়ের সঙ্গে জামায়াতের পুরনো দোস্তি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আইএসআই এজেন্টদের সঙ্গে জামায়াত নেতাদের সৌদি আরবে বৈঠক হয়েছে এবং দুই পক্ষ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছে। এসব দাবিও মূলত গোয়েন্দা নথি ও সূত্রের বরাতে উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাদের রাজনীতি কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়।
২০ ডিসেম্বর প্রকাশিত ‘আইএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ আছে তারেক রহমানের’ শিরোনামের প্রতিবেদনেদাবি করা হয়, সৌদি আরবের জেদ্দায় তারেক রহমানের সঙ্গে আইএসআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে। দুবাইয়ের একজন বিএনপি নেতার মাধ্যমে দুই পক্ষের যোগাযোগ চলত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আইএসআইয়ের পছন্দের ৩০০ আসনের প্রার্থী তালিকাও তারেক রহমানের কাছে পৌঁছানো হয়েছিল।
২১ ডিসেম্বর প্রকাশিত ‘বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী তালিকা আইএসআইয়ের তৈরি!’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আইএসআই ৩০০ আসনের একটি প্রার্থী তালিকা তৈরি করে বিএনপি ও জামায়াতের কাছে পাঠিয়েছে এবং তারেক রহমান সেই তালিকা গ্রহণ করেছেন। এ প্রতিবেদনেও অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে বিভিন্ন ‘সূত্র’ ও ‘গোয়েন্দা নথি’র কথা বলা হলেও সেসব নথি বা প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
২২ ডিসেম্বর প্রকাশিত ধারাবাহিকের শেষ পর্ব ‘চীনকে পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করে আইএসআই!’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সহায়তায় বিএনপি চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের চেষ্টা করছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইএসআইয়ের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের কথোপকথনের তথাকথিত নথিতে এ সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া গেছে এবং ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও আইএসআই মদদ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আইএসআইয়ের সহায়তায় বিএনপি চীনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, আওয়ামী লীগ সরকার ও ভারতবিরোধী প্রচারণা চালানো এবং কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন টকশোর মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার পরিকল্পনা করেছিল। এসব অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে ‘গোয়েন্দা সূত্র’, ‘একাধিক সূত্র’ ও ‘নথিপত্রের’ কথা উল্লেখ করা হলেও সেসব নথি বা তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ধারাবাহিকটির পাঁচটি প্রতিবেদনে একই ধরনের একটি সম্পাদকীয় প্যাটার্ন দেখা যায়। একাধিক গুরুতর অভিযোগ করা হলেও সেগুলোর পক্ষে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য, নথি বা প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।