বাংলাদেশের কারা অধিদপ্তরের প্রতিপাদ্য ‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’। কথা ছিল, বন্দিদের অপরাধী হিসেবে দেখা হবে না। তাদের সংশোধন ও সুপ্রশিক্ষিত করে সভ্য সমাজের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হবে দেশের কারাগারগুলোয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন তথ্য। ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দি, নোংরা জনাকীর্ণ পরিবেশে বন্দিদের রীতিমতো করতে হয় বেঁচে থাকার সংগ্রাম। এরই মধ্যে প্রতিবছর অসংখ্য বন্দির মৃত্যু হয়। যার মধ্যে রয়েছে দুঃখ ও হতাশায় আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার মতো ঘটনাও।
গত ২২ নভেম্বর প্রতিদিনের মতোই ময়মনসিংহ কেন্দ্রিয় কারাগারে বন্দিদের দেখাশোনা করছিলেন এক কারারক্ষীরা। হঠাৎ সোহেল রানা (৪০) নামের এক বন্দির দিকে নজর যায় কারারক্ষীর। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ওই বন্দি কিছু একটা খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে কারাগারের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান সংশ্লিষ্টরা। পরে বিভিন্ন চিকিৎসা শেষে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
কারা কর্তৃপক্ষের চেষ্টায় সোহেল রানাকে বাঁচানো গেলেও দুঃখ ও হতাশা থেকে কারাগারে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে প্রায়ই। বিভিন্ন পন্থায় এরা বেছে নেন মৃত্যুর পথ। কারাগারে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তা বললেন, নানান কারণে হতাশায় ভোগেন বন্দিরা। বিশেষ করে মাদকাসক্তি ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা কম বয়সী বন্দিদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। আর সেখান থেকেই তারা বেছে নেন এই পথ।
সোহেল রানার আত্মহত্যার সময় ময়মনসিংহ কেন্দ্রিয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ছিলেন মো. আমিরুল ইসলাম। তিনি বলছিলেন, ‘সুস্থ হওয়ার পর সোহেল রানার কাছে আত্মহত্যার কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, ওইদিন সকালে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় সে তার শাস্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে বলেছিল। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া আসেনি। বরং, তার কারণে পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে এমন কথা বলে বকাঝকা করা হয়। সেই রাগ ও দুঃখ থেকে সোহেল আত্মহত্যার চিন্তা করে।’
সোহেল রানা ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ভ্যানচালক জাহিদুল ইসলাম হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি। ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. সামছুদ্দিন তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। এরপর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েনে তিনি। তার রায়ের বিরুদ্ধে স্বজনরা কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিবারের সঙ্গেও চলছিল সম্পর্কের টানাপোড়েন।
২০২৫ এর ১৫ জুন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সূর্যমুখী ভবনের একটি কক্ষে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সুজন (৪৫)। তার বিরুদ্ধে ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ। সব মিলিয়ে ১৫টি মামলার আসামি তিনি। কোনো মামলার সুরাহা হওয়ার আগেই স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেন সুজন।
৫ বছরে মৃত্যু ৮৮৬, আত্মহত্যা ২.১৪ শতাংশ
কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ছয় জন বন্দি আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রিয় কারাগারে দুই জন, কাশিমপুর কেন্দ্রিয় কারাগারে এক জন, টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে এক জন, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে এক জন এবং বগুড়া জেলা কারাগারে এক জন। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন পুরুষ। এর আগে ২০২৪ সালে ৩ জন পুরুষ বন্দি আত্মহত্যা করেন। ২০২৩ সালে এক জন পুরুষ ও একজন নারী আত্মহত্যা করেন। ২০২২ সালে ৩ জন পুরুষ ও ১ জন নারী বন্দি আত্মহত্যা করেন। ২০২১ সালে সেই সংখ্যা ছিল ৪ জন। তারা সবাই পুরুষ ছিলেন।
গত পাঁচ বছরে কারাবন্দির মৃত্যুর তুলনায়ও ২০২৫ সালে কারাগারের ভেতর আত্মহত্যার হার বেশি দেখা গেছে। গতবছর কারাগারে ১১২ জন বন্দি মারা যায়। কারাবন্দির মৃত্যুর তুলনায় আত্মহত্যার হার ছিল ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এছাড়া ২০২৪ সালে ১৮৯ জন বন্দি মারা যায়। সেই তুলনায় আত্মহত্যার হার ছিল ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ২০২৩ সালে বন্দি মারা যায় ২৩২ জন। সেই তুলনায় আত্মহত্যার হার ছিল ০ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ২০২২ সালে কারাগারে ১৩৯ জন বন্দি মারা যায়। সেই তুলনায় আত্মহত্যার হার ছিল ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০২১ সালে ২১৪ জন বন্দি মারা যায়। সেই তুলনায় আত্মহত্যার হার ছিল ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সবমিলিয়ে গত পাঁচ বছরে মৃত্যুর সংখ্য ৮৮৬ জন, এরমধ্যে আত্মহত্যা করেছে ১৯ জন। যা মোট মৃত্যুর ২ দশমিক ১৪ শতাংশ।
আত্মহত্যার যেসব কারণ জানা গেল
মূলত বন্দিরা যখন কারাগারে যায়, তাদের অনেকেই থাকে মাদকাসক্ত। কারাগারে মাদক গ্রহণ করতে না পেরে অনেকে হতাশায় ভোগে। আবার অনেক বন্দির সঙ্গে তাদের পরিবার যোগাযোগ করে না, দেখা করতে আসে না। এটিও তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি করে। এছাড়া অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অবস্থার পরিবর্তন, ঘন ঘন কারাবাসও তাদের মধ্যে হতাশার জন্ম দেয়। অনেকে আবার আত্মগ্লানিতেও ভোগেন। এসব চাপ সামাল দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা দেশের কারাগারগুলোয় না থাকায় বাড়ে আত্মহত্যার সংখ্যা, এমনটাই মনে করেন বন্দিদের নিয়ে কাজ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সামাজিক সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ বলছিলেন, ‘সারাদেশের মতোই জেলে থাকা বন্দিদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেড়েছে। এর অনেকগুলো কারণ আছে। আত্মহত্যার প্রধান কারণ একাকিত্ব। জেলের মধ্যে যারা থাকে, তারা অনেকটা সময় একাকি কাটায়। যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।’
‘জেলে থাকা বন্দিরা কোনো না কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যার কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ আসে। এটাও তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। এছাড়া, বন্দিরা পরিবার, বন্ধু-বান্ধব থেকে দূরে থাকে। যে কারণে তারা তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া হতাশা কারো কাছে বলতে পারে না। এর ফলে তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হয়’, যোগ করলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরীও প্রায় একই কথাই বললেন। তার মতে, কারাগারে থাকা বন্দিদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতা তৈরি হয়। নিজেকে মূল্যহীন মনে করা থেকে বন্দিদের হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা আসে। আবার অনেক সময় অপরাধবোধও তৈরি হয়।
আত্মহত্যা রোধে কারা কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ
বন্দিদের আত্মহত্যা রোধে কারা কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ই পদক্ষেপ নিয়েছে। সবশেষ গত ২৩ নভেম্বর কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. তানভীর হোসেনের সই করা এক অফিস আদেশেও কারাগারের ভেতর নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। বন্দিদের কাছে যেন এমন কোনো জিনিস না যায় যেগুলো খেয়ে বা ব্যবহার করে আত্মহত্যা করা যায়, সে বিষয়ে দেওয়া হয় স্পষ্ট নির্দেশনা।
জেল কোডে যা রয়েছে
বাংলাদেশ জেল কোড অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে একজন সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা, একজন মনোবিজ্ঞানী ও একজন সমাজ বিজ্ঞানী থাকার কথা। সব জেলা কারগারে একজন সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা ও একজন মনোবিজ্ঞানী থাকবেন বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। যাদের নিয়োগ দেবে সরকার এবং যারা বন্দিদের সব অভিযোগ সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখবেন, তাদের মুক্তির পর পূণর্বাসনের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন এবং অপরাধীদের জন্য গৃহীত প্রশিক্ষণ ও কর্মসূচী বাস্তবায়নে কারা প্রশাসনকে সহায়তা করবেন। তবে কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কোনো কারাগারে বর্তমানে সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা, মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানী নেই।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘বর্তমানে একটি কারাগারে এই পদ থাকলেও কেউ নিয়োগপ্রাপ্ত নেই। আমরা কারেকশন সার্ভিস প্রবেশ করছি। সেখানে প্রতিটি কারাগারে মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও কাউন্সিলর নিয়োগ দেওয়া কথা প্রস্তাব করেছি।’
মোশন ডিটেকশন সিসি ক্যামেরার প্রস্তুতি
বন্দিদের আত্মহত্যা ঠেকাতে কারাগারগুলোতে মোশন ডিটেকটর সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানালেন জান্নাত-উল ফরহাদ। তিনি বললেন, ‘এটা লাগানো হলে কেউ আত্মহত্যা বা দাঙ্গার চেষ্টা করলে আমরা অ্যালার্মের মাধ্যমে সতর্ক হতে পারব। এটা এখন পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে আছে। কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রিয় কারাগারে এই প্রকল্প শুরু হচ্ছে।’
আত্মহত্যা ঠেকাতে হলে বন্দিদের হতাশা দূর করতে হবে, যোগ করলেন তিনি। বললেন, ‘হতাশা দূর করা গেলে আত্মহত্যা ঠেকানো যাবে। বন্দির যৌক্তিক চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে হবে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা যখন দেখি কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করছে, তখন আমরা তার পরিবারকে চিঠি পাঠাই। যাতে তারা ওই বন্দির সঙ্গে দেখা করতে আসে। আমরা এমন চিঠি দিয়ে অনেকগুলো ঘটনায় ভালো ফলাফল পেয়েছি।’
এছাড়া আত্মহত্যার প্রবণতা আছে এমন বন্দিদের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করে তার প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা করছেন বলেও জানালেন তিনি। বললেন, ‘তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি। আর যাদের চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের চিকিৎসাও দেওয়া হয়।’