দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। আজ রবিবার টাঙ্গাইলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ, নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর এবং ঝালকাঠিতে মানববন্ধন পালিত হয়েছে।
টাঙ্গাইলে মহাসড়ক অবরোধ
রবিবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং চরম দুর্ভোগে পড়ে যাত্রীরা।
অবরোধে অংশ নেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের ডুবাইল, নাটিয়াপাড়া, সেহড়াতৈল, ইসলামপুর ও পড়াইখালি এলাকার বাসিন্দারা। এছাড়া মির্জাপুরের মহেরা, জামুর্কী ও পাকুল্লা এলাকার প্রায় চার শতাধিক মানুষ।
বিক্ষোভকারীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো সমাধান না পাওয়ায় তারা মহাসড়ক অবরোধ করতে বাধ্য হয়েছেন। পরে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিলে তারা অবরোধ প্রত্যাহার করেন। এতে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, বিদ্যুতের দাবিতে স্থানীয়রা মহাসড়ক অবরোধ করেছিলেন। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা এসে আশ্বাস দেওয়ার পর তারা অবরোধ তুলে নেন। এরপর পুলিশ দ্রুত যানজট নিরসনে কাজ করে।
মির্জাপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মো. মোখলেসুর রহমান বলেছেন, ‘স্থানীয়দের দাবি, মির্জাপুর পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের বিদ্যুৎ সংযোগের সঙ্গে তাদের এলাকাকেও সংযুক্ত করা, যাতে লোডশেডিং কম হয়। এ বিষয়ে আশ্বাস দেওয়ার পর তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।’
কেন্দুয়ায় বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর
নেত্রকোনায় বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময় লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুব্ধ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কেন্দুয়া জোনাল অফিসে ভাঙচুর চালিয়েছে স্থানীয়রা। আজ রবিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আর্জেন্টিনা -জর্ডান ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমে ছিল। ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় সেই ক্ষোভ চরমে পৌঁছে এবং এর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অফিসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিনের লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমে ছিল। রবিবার সকালে আর্জেন্টিনা বনাম জর্ডানের ম্যাচ চলাকালে লোডশেডিং হওয়ায় সেই ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। তাদের দাবি, সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কেন্দুয়ার জোনাল অফিসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, কেন্দুয়ার জনসংখ্যা ৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৭৬। পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক প্রায় ৯৪ হাজার। এ উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ২৭ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে ৭ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কেন্দুয়ায় মোট ১২টি ফিডার সচল। এর মধ্যে কেন্দুয়া এলাকায় ৮টি এবং রামপুর এলাকায় ৪টি ফিডার। যদিও কাগজে-কলমে ফিডারের সংখ্যা ১৩টি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৪ নম্বর ফিডারটি দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীভাবে বন্ধ। বর্তমানে কেন্দুয়া এলাকার ৮টি ফিডারের মধ্যে ৬টিই বন্ধ। ময়মনসিংহ গ্রিডের মাধ্যমে নেত্রকোনো হয়ে কেন্দুয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
কেন্দুয়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম) প্রকৌশলী মো. ফরিদ আহম্মেদ বলেছেন, ‘অফিস ভাঙচুরের ঘটনাটি মৌখিকভাবে থানাকে অবহিত করা হয়েছে। তাছাড়া আমাদের যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার বাইরে কিছু করার সুযোগ নেই। বরাদ্দ অনুযায়ীই গ্রাহকদের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।’
কেন্দুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বললেন, ‘পল্লী বিদ্যুৎ অফিস থেকে মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাই নাই। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত ।’
ঝালকাঠিতে মানববন্ধন
অসহনীয় লোডশেডিং, গ্রাহক হয়রানি এবং বিদ্যুৎ অফিসের নানা অনিয়মের প্রতিবাদে রবিবার সকাল ১১টার দিক ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে ‘মানব কল্যাণ সোসাইটি।’
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সিনিয়র সাংবাদিক দুলাল সাহা, দৈনিক দূরযাত্রার সম্পাদক ও ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি জিয়াউল হাসান পলাশ, সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম জলিল, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত দাস হরি, উজ্জ্বল রহমানসহ আরও অনেকে।
বক্তারা জানান, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জেলাজুড়ে দিন-রাত ঘন ঘন লোডশেডিং চলছে। শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। এছাড়া শনিবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত চার থেকে পাঁচবার লোডশেডিং হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে গ্রাহক হয়রানি, প্রশাসনিক অনিয়ম ও ভূতুড়ে বিলের সমস্যাও দীর্ঘদিনের। এসব কারণে গ্রাহকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
মানববন্ধন থেকে অবিলম্বে অতিরিক্ত লোডশেডিং বন্ধ করে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত, বিদ্যুৎ অফিসের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ এবং গ্রাহক হয়রানি ও অতিরিক্ত বিলের অবসান ঘটিয়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন বক্তারা।
ঢাকাতেও লোডশেডিং
দেশের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাতেও দিতে হচ্ছে লোডশেডিং। জাতীয় সংসদে রোববার কার্যপ্রণালি বিধির ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য তুলে ধরেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারের টিউবে লিক হওয়ায় বাধ্য হয়ে উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় কয়লা খালাস করা সম্ভব না হওয়ায় আরেকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তবে কেন্দ্র দুটির নাম উল্লেখ করেননি তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উৎপাদন বন্ধ থাকা কেন্দ্র দুটি হলো বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কক্সবাজারের এস এস পাওয়ার প্ল্যান্ট।
এ পরিস্থিতিকে জাতীয় সংকট হিসেবে উল্লেখ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সংকট মোকাবিলার আহ্বান জানান বিদ্যুৎমন্ত্রী। তার আশা, আগামী দুই দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। উৎপাদন স্বাভাবিক হলে লোডশেডিংও কমে আসবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরেই দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। ছুটির দিনেও বিদ্যুতের ঘাটতি কমেনি।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডে চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে বিতরণ সংস্থাগুলোকে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তাৎক্ষণিকভাবে সংকট কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বৃষ্টিপাত। বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কমবে, একই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও হ্রাস পাবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বৃষ্টি ও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।